চাকরির আশা ছেড়ে দিচ্ছে পূর্ব এশিয়ার তরুণরা

চাকরির আশা ছেড়ে দিচ্ছে পূর্ব এশিয়ার তরুণরা: কেন ঘটছে এমনটা?

একসময় একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, ভালো ফল করা এবং একটি স্থায়ী চাকরি পাওয়া—এটাই ছিল অনেক তরুণের জীবনের স্বাভাবিক পথ।

কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনের মতো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে এমন তরুণের সংখ্যা, যারা শুধু বেকারই নন—তারা চাকরি খোঁজাও প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সমাজ, শিক্ষা এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের একটি বড় সংকেত।

নতুন এক প্রজন্মের জন্ম

জাপানে এই প্রজন্মকে বলা হয় “Resignation Generation” বা হাল ছেড়ে দেওয়া প্রজন্ম।

চীনে পরিচিত “Lying Flat” নামে। অর্থাৎ, জীবনের কঠিন প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা।

দক্ষিণ কোরিয়ায় আবার অনেক তরুণকে বলা হচ্ছে “Just Resting”—যারা চাকরিতে নেই, আবার চাকরি খোঁজার চেষ্টাও করছেন না। দেশটিতে এমন মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে কয়েক লাখে পৌঁছেছে।

কেন তারা চাকরি খোঁজা ছেড়ে দিচ্ছে?

এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।

১. ভালো চাকরির সংখ্যা কমে যাচ্ছে

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের মতো নেই। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বের হচ্ছে।

ফলে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মানসম্মত চাকরি সেই হারে তৈরি হচ্ছে না।

২. AI বদলে দিচ্ছে কর্মবাজার

আগে যেসব কাজ শুধু মানুষ করতে পারত, এখন তার অনেকগুলোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) করতে পারছে।

যেমন—

  • লেখা,
  • প্রোগ্রামিং,
  • মার্কেটিং,
  • তথ্য বিশ্লেষণ,
  • এমনকি ওষুধ গবেষণার কিছু কাজও।

ফলে বিশেষ করে নতুন ও তরুণ কর্মীদের জন্য সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

আরো পড়ুন :  চাকরি নয়, ক্যারিয়ার গড়ুন: ওয়ালমার্টের নতুন উদ্যোগ থেকে যে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ

৩. অনেক পড়াশোনা, কিন্তু সুযোগ কম

অনেক তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছেন না।

বারবার ব্যর্থতার পর অনেকে মনে করছেন, চেষ্টা করেও লাভ নেই।

এ কারণেই তারা চাকরির বাজার থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন।

শুধু আয়ের বিষয় নয়

একটি চাকরি শুধু মাস শেষে বেতন দেয় না।

এটি একজন মানুষের—

  • পরিচয়,
  • আত্মসম্মান,
  • সামাজিক অবস্থান,
  • এবং জীবনের উদ্দেশ্যও তৈরি করে।

যখন একজন তরুণ বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তাঁর জন্য কোনো জায়গা নেই, তখন তার মানসিক ও সামাজিক প্রভাবও গভীর হয়।

তাহলে সমাধান কী?

The Diplomat-এর বিশ্লেষণ বলছে, শুধু নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়।

বরং প্রয়োজন—

  • শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন,
  • সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ,
  • AI-এর সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা,
  • এবং কর্মীদের এমন স্বাধীনতা দেওয়া, যাতে তারা নিজের কাজকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা এটিকে Job Crafting বলেন—অর্থাৎ কর্মীরা যেন নিজের দক্ষতা, আগ্রহ ও প্রযুক্তিকে মিলিয়ে কাজের ধরন আরও কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে পারেন।

বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?

বাংলাদেশেও প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন।

অন্যদিকে AI ও অটোমেশন দ্রুত পরিবর্তন আনছে বিভিন্ন পেশায়।

দেশের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক তরুণ বর্তমানে কাজে নেই, পড়াশোনায় নেই, এমনকি কোনো প্রশিক্ষণেও নেই। দক্ষতার ঘাটতি ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। (ডেইলি স্টার)

এ অবস্থায় শুধু ডিগ্রি অর্জন করাই যথেষ্ট হবে না।

প্রয়োজন এমন দক্ষতা, যা—

  • AI-এর সঙ্গে কাজ করতে পারে,
  • বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে,
  • এবং সহজে যন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

Career Intelligence-এর পর্যবেক্ষণ

পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

চাকরির ভবিষ্যৎ শুধু কতগুলো নতুন পদ সৃষ্টি হবে, তার ওপর নির্ভর করছে না। বরং নির্ভর করছে মানুষ কত দ্রুত নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।

আরো পড়ুন :  উন্নয়ন খাতে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট চাকরি: কোথায় বেশি সুযোগ, কত বেতন?

আজ যারা পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেবে, তারাই আগামী দিনের কর্মবাজারে এগিয়ে থাকবে।

শেষ কথা

একটি বিষয় পরিষ্কার—

ভবিষ্যতের কর্মজীবনে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম মানুষ নয়; বরং মানুষ + AI বনাম শুধু মানুষ।

তাই হতাশ হয়ে চাকরির আশা ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে, নতুন দক্ষতা শেখা, প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো এবং নিজেকে নিয়মিত উন্নত করাই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে কার্যকর ক্যারিয়ার কৌশল।

 

0

এধরনের আরো চমৎকার লেখা পড়তে আপনার ইমেইল সাবমিট করুন-
লেখা প্রকাশের সাথে সাথেই আপনার কাছে তা পাঠিয়ে দেবো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top