স্কিল শিখছি, ডিগ্রি পাচ্ছি—কিন্তু চাকরি কোথায়?

স্কিল শিখছি, ডিগ্রি পাচ্ছি—কিন্তু চাকরি কোথায়?

আজকাল স্কুল-কলেজে “ক্যারিয়ার” শব্দটি খুব পরিচিত। কোথাও AI শেখানো হচ্ছে, কোথাও রোবোটিক্স, কোথাও কোডিং, আবার কোথাও বিভিন্ন ধরনের স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স চালু হয়েছে।

সবকিছু দেখে মনে হয়, শিক্ষার্থীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত।

কিন্তু একটি প্রশ্ন কি আমরা করছি?

এসব শেখার পর সত্যিই কি তাদের জন্য পর্যাপ্ত চাকরি আছে?

সম্প্রতি Fast Company-তে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ এই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে। লেখাটির মূল বক্তব্য হলো—আমরা ক্যারিয়ারের পথ তৈরি করছি ঠিকই, কিন্তু সেই পথের শেষে বাস্তব কর্মসংস্থানের সঙ্গে অনেক সময় কোনো সংযোগ থাকছে না।

শিক্ষা একদিকে, চাকরির বাজার আরেকদিকে

অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নতুন কোর্স চালু করার সময় প্রথমে দেখে—

  • আমাদের কী ধরনের শিক্ষক আছেন?
  • কী ধরনের ল্যাব বা যন্ত্রপাতি আছে?
  • কোন বিষয়ে অর্থায়ন পাওয়া যাবে?

তারপর সেই অনুযায়ী একটি ক্যারিয়ার প্রোগ্রাম তৈরি করা হয়।

কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই প্রথম প্রশ্নটি করা হয়—

চাকরির বাজার আসলে কী ধরনের মানুষ খুঁজছে?

ফলে অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি বা সনদ নিয়ে বের হলেও চাকরির বাজারে গিয়ে বুঝতে পারে, নিয়োগদাতারা যে দক্ষতা চাইছেন, তার অনেকটাই তাদের নেই।

শুধু বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়

ভাবুন, একজন শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যবিজ্ঞান নিয়ে পড়েছে। বই থেকে মানুষের শরীর সম্পর্কে অনেক কিছু জানে। কিন্তু বাস্তবে রোগীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই।

অথবা কেউ প্রকৌশল পড়েছে, কিন্তু আধুনিক শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সফটওয়্যার বা প্রযুক্তির সঙ্গে কখনো কাজ করেনি।

এ ধরনের শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দিতে অনেক প্রতিষ্ঠান দ্বিধায় পড়ে।

আরো পড়ুন :  অগ্রণী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার নিয়োগ

কারণ চাকরির বাজার এখন শুধু সনদ নয়, কাজ করার সক্ষমতা খুঁজছে।

যে দক্ষতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি

গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে চাকরির বিজ্ঞাপনের বড় একটি অংশে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, মানুষের কিছু মৌলিক দক্ষতাও চাওয়া হচ্ছে।

যেমন—

  • পরিষ্কারভাবে কথা বলতে পারা
  • সমস্যা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা
  • দলবদ্ধভাবে কাজ করার দক্ষতা
  • নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া
  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা

এসব দক্ষতাকে এখন Durable Skills বলা হয়। কারণ প্রযুক্তি বদলালেও এই দক্ষতাগুলোর গুরুত্ব কমে না।

AI বদলে দিচ্ছে চাকরির বাস্তবতা

চাকরির বাজার এখন খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে একটি সাধারণ চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বদলে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) কারণে আগামী কয়েক বছরে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হবে।

অর্থাৎ, আজ যে দক্ষতা দিয়ে চাকরি পাওয়া যাচ্ছে, পাঁচ বছর পরে সেটি যথেষ্ট নাও হতে পারে।

তাই আজীবন শেখার অভ্যাস এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি প্রয়োজন।

শুধু টেকনিক্যাল স্কিল নয়

অনেকেই মনে করেন, একটি সফটওয়্যার শিখলেই বা একটি প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করলেই ভালো চাকরি পাওয়া যাবে।

বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।

আবার শুধু ভালো যোগাযোগ দক্ষতা থাকলেও হবে না।

সফল হতে হলে দরকার—

প্রযুক্তিগত দক্ষতা + মানবিক দক্ষতা + শেখার মানসিকতা।

এই তিনটির সমন্বয়ই একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে কর্মজীবনে এগিয়ে রাখে।

বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?

বাংলাদেশেও এখন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নতুন নতুন স্কিল কোর্স চালু করছে।

এটি অবশ্যই ইতিবাচক।

তবে আমাদের আরও একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে—

আমরা যা শেখাচ্ছি, সেটির কি সত্যিই চাকরির বাজারে চাহিদা আছে?

যদি বাজারের চাহিদা না জেনে শুধু কোর্স বাড়ানো হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর সনদ বাড়বে, কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে না।

Career Intelligence-এর পর্যবেক্ষণ

একটি ভালো ক্যারিয়ার প্রোগ্রাম শুরু হওয়া উচিত শ্রেণিকক্ষ থেকে নয়, চাকরির বাজার থেকে।

আরো পড়ুন :  বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ৫ চাকরি

প্রথমে জানতে হবে—

  • আগামী পাঁচ বছরে কোন খাতে নতুন চাকরি তৈরি হবে।
  • নিয়োগদাতারা কী ধরনের দক্ষতা খুঁজছেন।
  • প্রযুক্তির কারণে কোন কাজ বদলে যাচ্ছে।
  • শিক্ষার্থীদের কী শেখালে তারা বাস্তবে কর্মজীবনে সফল হবে।

এরপর সেই অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।

শেষ কথা

আজকের পৃথিবীতে শুধু ডিগ্রি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়।

আবার শুধু একটি দক্ষতা শিখেও নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না।

শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত—এমন মানুষ তৈরি করা, যারা নতুন কিছু শিখতে পারে, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে।

ক্যারিয়ারের পথ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই পথের শেষে যেন সত্যিই একটি কর্মসংস্থানের দরজা খোলা থাকে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

0

এধরনের আরো চমৎকার লেখা পড়তে আপনার ইমেইল সাবমিট করুন-
লেখা প্রকাশের সাথে সাথেই আপনার কাছে তা পাঠিয়ে দেবো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top