নতুন উচ্চশিক্ষা মডেল কি কমাতে পারবে শিক্ষিত বেকার?

নতুন উচ্চশিক্ষা মডেল কি কমাতে পারবে শিক্ষিত বেকার?

প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। কিন্তু স্নাতক শেষ করার পরও অনেকের জন্য চাকরি যেন অধরাই থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক বেকার। দেশের মোট ২৬ লাখ ২০ হাজার বেকারের মধ্যে ডিগ্রিধারীরাই সবচেয়ে বড় অংশ। স্নাতকদের বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ, যা জাতীয় গড় বেকারত্বের হারের প্রায় তিন গুণ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, গত আট বছরে এই হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

জরিপে আরও দেখা গেছে, প্রতি তিনজন বেকার স্নাতকের একজনকে পড়াশোনা শেষ করার পর দুই বছর পর্যন্ত চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যা শেখানো হচ্ছে এবং চাকরির বাজার যা চাইছে—দুটির মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে।

কেন ডিগ্রি থাকলেও চাকরি মিলছে না?

আজকের নিয়োগদাতারা শুধু ভালো ফলাফল বা সনদপত্র দেখছেন না।

তারা চাইছেন—

  • বাস্তব অভিজ্ঞতা
  • ডিজিটাল দক্ষতা
  • সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা
  • যোগাযোগ দক্ষতা
  • পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা

অথচ আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো এমন একটি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়।

তাই আসছে নতুন চিন্তা

সরকার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে।

নতুন কাঠামো অনুযায়ী, শিক্ষার মাত্র ৪০ শতাংশ থাকবে প্রচলিত একাডেমিক জ্ঞানের ওপর। বাকি অংশে গুরুত্ব দেওয়া হবে—

  • ব্যবহারিক দক্ষতা
  • ইন্টার্নশিপ
  • প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা
  • উদ্যোক্তা উন্নয়ন
  • ক্যারিয়ার প্রস্তুতি

শিক্ষামন্ত্রীর ভাষায়, লক্ষ্য হলো শুধু ডিগ্রিধারী নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা।

শুধু সংস্কার ঘোষণা করলেই হবে?

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের ইতিহাস নতুন নয়।

১৯৭৪ সালের কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে একাধিক সংস্কার প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক উদ্যোগই আংশিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থেকেছে।

তাই প্রশ্ন হলো, এবার কি সত্যিই পরিবর্তন আসবে?

বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে

একটি বিষয় এখন পরিষ্কার—শুধু ডিগ্রি আর চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিজেদেরও কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে—

  • প্রযুক্তিগত দক্ষতা
  • ইংরেজি ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা
  • উপস্থাপনা করার ক্ষমতা
  • টিমওয়ার্ক
  • ইন্টার্নশিপ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা
  • নেটওয়ার্কিং
  • সমস্যা সমাধানের দক্ষতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের মৌলিক কিছু দক্ষতা তৈরিতে ভূমিকা রাখলেও চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা, নেটওয়ার্কিং এবং সফট স্কিল উন্নয়নে এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে।

Career Intelligence-এর দৃষ্টিতে

আগামী দশকের সবচেয়ে সফল গ্র্যাজুয়েটরা হয়তো তারা হবে না, যারা শুধু সর্বোচ্চ সিজিপিএ নিয়ে বের হবে।

বরং এগিয়ে থাকবে সেই তরুণরা—

  • যারা পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন করবে;
  • যারা ইন্টার্নশিপ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করবে;
  • যারা প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করতে শিখবে;
  • এবং যারা নিজেকে আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলবে।

শেষ কথা

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সামনে এখন একটি বড় প্রশ্ন—

আমরা কি শুধু ডিগ্রিধারী তৈরি করব, নাকি কর্মদক্ষ, সমস্যা সমাধানকারী এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত মানুষ তৈরি করব?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের কর্মসংস্থান, অর্থনীতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ।


এধরনের আরো চমৎকার লেখা পড়তে আপনার ইমেইল সাবমিট করুন-
লেখা প্রকাশের সাথে সাথেই আপনার কাছে তা পাঠিয়ে দেবো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha


Scroll to Top