বর্তমানে প্রথম চাকরি খুঁজে পাওয়া অনেক তরুণের জন্যই কঠিন হয়ে উঠেছে। অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ কমে যাওয়া এবং বিপুল সংখ্যক AI-সহায়ক চাকরির আবেদন নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অনেকে নিজেদের জন্য সুযোগ তৈরি করছেন। বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন এমন চারজন তরুণ, যারা একসময় শত শত আবেদন করেও খুব কম সাড়া পেতেন। পরে তারা একটি করে পরিবর্তন এনে নিজেদের প্রথম চাকরি নিশ্চিত করতে সক্ষম হন।
১. প্রতিটি চাকরির জন্য আলাদা সিভি তৈরি করুন
বার্মিংহামের ২৪ বছর বয়সী থেরেসা ব্লেয়ার ২০২৫ সালে অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মেসিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার সময় একটি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্লেসমেন্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে এই পেশায় আগ্রহী করে তোলে।
এরপর আট মাস ধরে তিনি শত শত চাকরির জন্য আবেদন করেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো উত্তর পেতেন না।
পরে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি বিভিন্ন নিয়োগদাতার কাছে একই ধরনের সাধারণ সিভি পাঠাচ্ছিলেন, যার কারণে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ছিল।
এরপর তিনি প্রতিটি চাকরির জন্য আলাদাভাবে সিভি তৈরি করতে শুরু করেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধ সম্পর্কে জানতেন এবং আবেদনপত্রে সেগুলোর উল্লেখ করতেন।
তার ভাষায়, শুধু আপনি কী কাজ করেছেন তা নয়, সেই কাজ থেকে কী দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং কেন আপনি উপযুক্ত প্রার্থী—সেটিও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা জরুরি।
তিনি আগের তুলনায় কম সংখ্যক চাকরিতে আবেদন করতে শুরু করেন, কিন্তু প্রতিটি আবেদনের জন্য বেশি সময় ব্যয় করেন।
প্রথমে তিনি একটি ব্যাংকের কাস্টমার সার্ভিস কল সেন্টারে পূর্ণকালীন চাকরি পান। বর্তমানে তিনি একজন প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন এবং সপ্তাহে তিন দিন লন্ডনে যাতায়াত করেন।
তার যাতায়াত প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় নিলেও তিনি এটিকে মূল্যবান অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন।
যারা প্রথম চাকরি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশে তার পরামর্শ—কঠিন হলেও আবেদন চালিয়ে যেতে হবে। কারণ বর্তমান চাকরির বাজার সহজ নয়, কিন্তু একদিন নিয়োগদাতারা আপনার প্রচেষ্টার মূল্য অবশ্যই দেখবেন।
২. যে কাজ করতে চান, সেই ক্ষেত্রের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন
সোমারসেটের ২৪ বছর বয়সী ক্যালাম স্টিভেন্স ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার সময় পরিবহন খাতের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
তিনি লিংকডইনে ব্রিস্টল সিটি কাউন্সিলে পরিবহন পরিকল্পনা বিষয়ক একটি ইন্টার্নশিপে কর্মরত একজন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
পরে যখন একই ইন্টার্নশিপের সুযোগ আবার আসে, তখন তিনি আবেদন করেন এবং নির্বাচিত হন।
তার আগে এই খাতে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি মনে করেন, শেখার আগ্রহ ও উৎসাহই তাকে অন্যদের থেকে এগিয়ে রেখেছিল।
পূর্ণকালীন এই ইন্টার্নশিপে তিনি ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছেন এবং এটি আগস্ট পর্যন্ত চলবে। ভবিষ্যতে এর মেয়াদ বাড়তে পারে, তবে তিনি ইতোমধ্যে স্থায়ী চাকরির সন্ধান শুরু করেছেন।
তার মতে, এই অভিজ্ঞতা তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মতোই মূল্যবান।
যারা ইন্টার্নশিপ খুঁজছেন, তাদের উদ্দেশে তার পরামর্শ—অস্থায়ী হওয়ার কারণে ইন্টার্নশিপকে কখনো ছোট করে দেখা উচিত নয়।
৩. চাকরির বাইরেও দায়িত্ব নিন
গ্লাসগোর ২৬ বছর বয়সী জশুয়া হপকিন্স প্রথমে বেলজিয়ামে ব্যবসা ও মার্কেটিং পড়া শুরু করলেও পরে শিক্ষানবিশ কর্মসূচিতে যোগ দেন।
বর্তমানে তিনি একটি আইন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার জন্য তিন বছরের একটি পেশাগত কোর্স করছেন।
তার আগের চাকরি ও বর্তমান চাকরির মাঝামাঝি সময়ে তিনি একটি হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন।
তিনি মনে করেন, এই অভিজ্ঞতা তাকে নিয়োগদাতাদের কাছে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। কারণ তরুণরাও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসতে পারে, এমন প্রশ্ন করতে পারে যা অন্যরা এড়িয়ে যায় এবং সীমিত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও মূল্য সংযোজন করতে পারে।
তার মতে, অন্যদের থেকে আলাদা হওয়ার সুযোগ দেয়—এমন যেকোনো কাজে যুক্ত হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা, সামাজিক কোনো উদ্যোগে যুক্ত হওয়া কিংবা স্বল্পমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো—এসবের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
তার ভাষায়, অনেক বড় পরিবর্তনের শুরু হয় শুধু উদ্যোগী হওয়ার মধ্য দিয়ে।
৪. শুধু অনলাইন নয়, সরাসরি যোগাযোগও করুন
লিডসের ২০ বছর বয়সী ক্লোভার নেলসন তিন বছর ধরে বেকার ছিলেন।
তিনি বিভিন্ন চাকরির ওয়েবসাইটে আবেদন করতেন, কিন্তু দশটির মধ্যে নয়বারই কোনো উত্তর পেতেন না।
অবশেষে তিনি ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন। অনলাইনে আবেদন পাঠানোর পরিবর্তে তিনি সরাসরি দোকানে গিয়ে ম্যানেজারদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন।
তার বিশ্বাস, এই মানবিক যোগাযোগই তাকে খুচরা বিক্রয় খাতে চাকরি পেতে সাহায্য করেছে।
তার পরামর্শ, শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর না করে দোকানের জানালায় দেওয়া বিজ্ঞপ্তির দিকেও নজর দেওয়া উচিত। কারণ অনলাইনে আবেদন করার সময় যে মানবিক সংযোগের অভাব থাকে, সেটিই কখনো কখনো পার্থক্য গড়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
গ্রিনউইচ বিজনেস স্কুলের ফ্যাকাল্টি এমপ্লয়েবিলিটি লিড টিউটর ক্যাথরিন লিওপোল্ড চাকরির জন্য আবেদন করার ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রথমত, নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে চিন্তা, গঠন ও সম্পাদনার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু নিজের কণ্ঠস্বরের বিকল্প হিসেবে নয়। নিয়োগদাতারা রোবটের তৈরি সাধারণ উত্তর নয়, বরং আপনার নিজস্ব সামর্থ্য সম্পর্কে জানতে চান।
দ্বিতীয়ত, শুধু আপনি কী করেছেন তা নয়, তার ফলে কী পরিবর্তন এসেছে—সেটি তুলে ধরতে হবে। উদাহরণ হিসেবে, যদি আপনি ভালো যোগাযোগ দক্ষতার কথা বলেন, তাহলে সেটি কীভাবে কোনো প্রকল্পের সফলতায় ভূমিকা রেখেছে, সেটিও ব্যাখ্যা করা উচিত।
তৃতীয়ত, সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে গুরুত্ব দিতে হবে। শত শত আবেদন পাঠানোর চেয়ে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানা, সম্পর্ক তৈরি করা এবং আবেদন করার আগেই নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলাই অনেক সময় বেশি কার্যকর হয়।
এ জন্য লিংকডইনে নিয়োগদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, পেশাজীবী কমিউনিটিতে যুক্ত হওয়া কিংবা অনলাইনে সংশ্লিষ্ট আলোচনা অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য শিক্ষা
বাংলাদেশেও চাকরির বাজার দিন দিন আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।
তাই শুধু ডিগ্রি অর্জন করাই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন—
- বাস্তব দক্ষতা অর্জন;
- একটি শক্তিশালী সিভি তৈরি করা;
- যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানো;
- ইন্টারভিউয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া;
- এবং প্রতিটি চাকরির জন্য আলাদা করে আবেদনপত্র সাজানো।
শেষ কথা
আজকের চাকরির বাজারে শুধু “আরও বেশি আবেদন” নয়, বরং “আরও ভালো আবেদন” করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ কখনো কখনো ৪০০টি সাধারণ আবেদন নয়, বরং একটি যত্ন নিয়ে তৈরি করা আবেদনই আপনার জন্য নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।
এধরনের আরো চমৎকার লেখা পড়তে আপনার ইমেইল সাবমিট করুন-




