২০০৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর অ্যালিসন ক্যাম্পবেল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম নামকরা আর্থিক প্রতিষ্ঠান মরগ্যান স্ট্যানলিতে চাকরি পান। এরপর একে একে বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এবং ক্যারিয়ারের সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠতে থাকেন।
সবকিছুই ভালো চলছিল। ভালো চাকরি, ভালো বেতন, নতুন নতুন দায়িত্ব—যে ধরনের ক্যারিয়ার অনেকেই স্বপ্ন দেখেন।
কিন্তু একসময় তিনি বুঝতে পারলেন, সফলতার এই যাত্রার একটা মূল্য তাকে দিতে হচ্ছে।
প্রায়ই পেটব্যথা হতো। মাথা ঝাপসা লাগত। সব সময় ক্লান্তি কাজ করত। তবে তিনি বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেননি। ভেবেছিলেন, এত ব্যস্ত জীবনে এসব তো স্বাভাবিক।
“আমরা অনেক সময় ক্লান্তিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই। মনে করি, সফল হতে হলে এমন কষ্ট করতেই হবে,” বলেন ক্যাম্পবেল।
একদিন ব্যবসায়িক সফর শেষে বাড়ি ফেরার পর হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে তাকে জরুরি বিভাগে যেতে হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন।
সেদিনই যেন তার চোখ খুলে যায়।
তিনি বুঝতে পারেন, কাজের পেছনে ছুটতে গিয়ে তিনি নিজের শরীর ও মানসিক সুস্থতাকে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা করে এসেছেন।
নতুন করে শুরু
সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। নিজের খাদ্যাভ্যাস বদলান, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম শুরু করেন এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনেন।
এই সময় তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বন্ধু ও সহকর্মীদের বলতে শুরু করেন। অবাক হয়ে দেখেন, তার মতো একই সমস্যায় আরও অনেক মানুষ ভুগছেন।
বাইরে থেকে তারা সফল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত, অবসন্ন এবং চাপে জর্জরিত।
ক্যাম্পবেল বলেন, “মানুষ শুধু টিকে থাকার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারা এতটাই চাপে থাকে যে পরিবর্তনের কথা ভাবার শক্তিও পায় না।”
এই অভিজ্ঞতা তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
দীর্ঘ ২০ বছর তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ করেছেন। এবার তিনি উপলব্ধি করলেন, কর্মদক্ষতা এবং ব্যক্তিগত সুস্থতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায়।
নতুন মিশন
২০২৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আনবার্ন্ট’ নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো কর্মক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় চাপ কমানো এবং কর্মীদের সুস্থ ও উৎপাদনশীল কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করা।
তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরণ বিশ্লেষণ করেন, কোথায় চাপ তৈরি হচ্ছে তা খুঁজে বের করেন এবং আরও কার্যকর ও মানবিক পদ্ধতিতে কাজ সাজানোর পরামর্শ দেন।
তার বিশ্বাস, একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর দলের সদস্যদের একটু থেমে নিজেদের কাজ মূল্যায়ন করার সুযোগ দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। এতে তারা সাফল্য উদযাপন করতে পারে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং পরবর্তী কাজের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারে।
বর্তমানে তিনি গবেষণাও করছেন—কীভাবে আধুনিক কর্মসংস্কৃতি, বিশেষ করে কোভিড-পরবর্তী সময় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের যুগে, কর্মীদের ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছে।
আত্মবিশ্বাসের প্রথম পাঠ
ক্যাম্পবেল মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন তাকে শুধু পড়াশোনা নয়, নেতৃত্বের শিক্ষাও দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে তার একজন মেন্টর তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু তখন তিনি নিজেই বিশ্বাস করতেন না যে তিনি এত বড় দায়িত্ব সামলাতে পারবেন।
পরে তিনি বুঝতে পারেন, অনেক সময় অন্যরা আমাদের ভেতরের সম্ভাবনাটা আগে দেখতে পায়।
ক্যাম্পবেল বলেন,
“আমার মেন্টর আমার মধ্যে এমন কিছু দেখেছিলেন, যা আমি নিজে তখনও দেখতে পাইনি। তার সেই বিশ্বাস আমাকে বদলে দিয়েছিল। তখনই প্রথম বুঝেছিলাম, আমিও অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারি।”
সফলতার সঙ্গে ভারসাম্যও দরকার
আজ ক্যাম্পবেল একজন উদ্যোক্তা, গবেষক এবং মা।
তাই তিনি এখন নিজের সময় ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে খুব সচেতন।
প্রতি সপ্তাহে তিনি তার ক্যালেন্ডার পর্যালোচনা করেন। যদি কাজের চাপ বেশি হয়, তাহলে কিছু কাজ পিছিয়ে দেন। কিন্তু কয়েকটি বিষয়ের সঙ্গে কখনো আপস করেন না—পরিবারকে সময় দেওয়া এবং নিয়মিত দৌড়ানো।
কারণ তিনি জানেন, এগুলোই তাকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখে।
তার ভাষায়,
“আপনি যখন নিজের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করেন, তখন অতিরিক্ত কাজ করার প্রলোভন সব সময় থাকে। কিন্তু আমি জানি, নিজেকে ভালো না রাখলে একজন উদ্যোক্তা, একজন অভিভাবক কিংবা একজন মানুষ হিসেবে আমার সেরাটা দেওয়া সম্ভব নয়।”
শেষে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন—
“নিজের যত্ন নেওয়া কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি আজীবনের অনুশীলন। আর মাঝপথে থেমে গেলেও সমস্যা নেই। নতুন করে শুরু করার জন্য কখনোই দেরি হয়ে যায় না।”
সূত্র: Bentley University
এধরনের আরো চমৎকার লেখা পড়তে আপনার ইমেইল সাবমিট করুন-



