চাকরির আবেদন করছেন, কিন্তু কোনো ইন্টারভিউ কল পাচ্ছেন না?
তাহলে হয়তো আপনার দক্ষতার চেয়ে বড় সমস্যা অন্য কোথাও।
আজকের চাকরির বাজারে অনেক প্রার্থী এমন কিছু পরামর্শ অনুসরণ করেন, যেগুলো সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব বা বিভিন্ন ক্যারিয়ার কোচের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু এসব পরামর্শের অনেকগুলোর পেছনে নির্ভরযোগ্য গবেষণা নেই।
সম্প্রতি The Conversation-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে Mount Royal University এবং University of Calgary-এর গবেষকরা চাকরি খোঁজার আধুনিক চারটি বহুল প্রচলিত ধারণা পরীক্ষা করে দেখেছেন। তাদের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট—অনেক জনপ্রিয় পরামর্শ আসলে ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
চলুন দেখে নেওয়া যাক, সেই মিথগুলো কী এবং গবেষণা আসলে কী বলছে।
মিথ–১ : “ATS ৭৫ শতাংশ সিভি বাতিল করে দেয়”
এই কথাটি হয়তো আপনিও বহুবার শুনেছেন।
এ কারণেই অনেক চাকরিপ্রার্থী হাজার হাজার টাকা খরচ করে “ATS Friendly Resume” বানান।
গবেষণা কী বলছে?
গবেষকরা এই দাবির উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখেছেন, ৭৫ শতাংশ সংখ্যাটির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
এটি এসেছে ২০১২ সালে Preptel নামে একটি রেজুমে সফটওয়্যার কোম্পানির একটি মার্কেটিং দাবির মাধ্যমে। কোম্পানিটি পরে বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা কখনোই এই পরিসংখ্যানের গবেষণা পদ্ধতি প্রকাশ করেনি।
অর্থাৎ আজও হাজারো ওয়েবসাইট যে সংখ্যা উদ্ধৃত করছে, তার পেছনে নির্ভরযোগ্য গবেষণা নেই।
তাহলে ATS আসলে কী করে?
ATS (Applicant Tracking System) মূলত আবেদনপত্র সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার।
সব ATS একই রকম নয়।
- কিছু সফটওয়্যার শুধু আবেদন সংরক্ষণ করে।
- কিছু মৌলিক যোগ্যতা যাচাই করে।
- বড় প্রতিষ্ঠানের কিছু উন্নত ATS AI ব্যবহার করে আবেদনকারীদের র্যাংক করতে পারে।
তবে “সব ATS মানুষের আগে সিভি বাতিল করে”—এমন ধারণা সঠিক নয়।
কী করবেন?
ATS-এর জন্য নয়, মানুষের জন্য সিভি লিখুন।
পরিষ্কার ভাষা, সহজ ফরম্যাট এবং চাকরির সঙ্গে সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা তুলে ধরুন।
মিথ–২ : “AI দিয়ে সিভি লিখলেই চাকরি পাওয়া সহজ”
বর্তমানে ChatGPT, Gemini বা অন্যান্য AI টুল ব্যবহার করে সিভি তৈরির প্রবণতা ব্যাপক।
অনেকে মনে করেন, AI-ই তাদের চাকরি এনে দেবে।
গবেষণা কী বলছে?
AI একটি শক্তিশালী সহকারী, কিন্তু এটি কোনো ম্যাজিক নয়।
গবেষণায় উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী—
- ৭৪% Hiring Manager AI দিয়ে তৈরি আবেদনপত্র সহজেই শনাক্ত করতে পারেন।
- ৮০% Hiring Manager অতিরিক্ত AI-নির্ভর আবেদনকে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন।
কারণ AI দিয়ে তৈরি অনেক সিভির ভাষা একই রকম হয়ে যায়। এতে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত অর্জন, অভিজ্ঞতা এবং স্বকীয়তা হারিয়ে যায়।
কী করবেন?
AI ব্যবহার করুন—
✔ ভাষা ঠিক করতে
✔ বানান ঠিক করতে
✔ বাক্য গুছিয়ে লিখতে
কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা, সাফল্য ও ব্যক্তিত্ব অবশ্যই নিজেই তুলে ধরুন।
মিথ–৩ : “ATS-Friendly টেমপ্লেট কিনলেই সমস্যা শেষ”
অনেক প্রতিষ্ঠান দাবি করে, তাদের তৈরি টেমপ্লেট ব্যবহার করলে ATS সহজে সিভি পড়বে।
গবেষণা কী বলছে?
গবেষকদের মতে—
Universal ATS-Friendly Resume বলে কিছু নেই।
কারণ—
একেক প্রতিষ্ঠানের ATS একেক রকম।
বরং আধুনিক ATS-এর বেশিরভাগই সাধারণ Word বা PDF ফরম্যাটের পরিষ্কার সিভি পড়তে পারে।
সমস্যা হয় মূলত—
- অতিরিক্ত গ্রাফিক্স,
- জটিল ডিজাইন,
- ছবি,
- আইকন,
- এবং অস্বাভাবিক লেআউট ব্যবহার করলে।
কী করবেন?
দামী টেমপ্লেট কেনার প্রয়োজন নেই।
তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—
- পরিষ্কার ফরম্যাট,
- প্রাসঙ্গিক কীওয়ার্ড,
- বাস্তব অর্জনের উদাহরণ,
- এবং সহজ ভাষা।
মিথ–৪ : “যত বেশি আবেদন, তত বেশি চাকরির সুযোগ”
অনেকেই দিনে ৫০–১০০টি চাকরিতে একই সিভি পাঠান।
ভাবেন, সংখ্যা বাড়লেই সফলতার সম্ভাবনা বাড়বে।
গবেষণা কী বলছে?
গবেষকদের মতে, এই কৌশল অনেক সময় উল্টো ক্ষতি করে।
কারণ প্রতিটি আবেদন যদি একই রকম হয়, তাহলে সেটি নিয়োগদাতার কাছে আলাদা করে চোখে পড়ে না।
AI-এর কারণে এখন “Workslop” নামে একটি নতুন শব্দও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এর অর্থ—
এমন বিপুল পরিমাণ সাধারণ ও ব্যক্তিত্বহীন কনটেন্ট, যা পড়ে বোঝা যায় না আবেদনকারী আসলে কে।
কী করবেন?
১০০টি আবেদন করার চেয়ে ১০টি ভালো আবেদন করুন।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য—
- সিভি সামান্য পরিবর্তন করুন,
- কভার লেটার কাস্টমাইজ করুন,
- প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে জানুন,
- এবং কেন আপনি সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত—তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন।
গবেষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা
প্রযুক্তি বদলেছে।
AI এসেছে।
ATS এসেছে।
কিন্তু চাকরি পাওয়ার মূল সূত্র বদলায়নি।
এখনও নিয়োগদাতারা খোঁজেন—
- বাস্তব দক্ষতা,
- প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা,
- সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা,
- শেখার আগ্রহ,
- এবং বিশ্বাসযোগ্যতা।
প্রযুক্তি আপনাকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু আপনার হয়ে চাকরি পাবে না।
বাংলাদেশের চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এই গবেষণার বার্তা
বাংলাদেশেও এখন “ATS Resume”, “AI CV”, “Guaranteed Interview”—এসব সেবার বাজার দ্রুত বাড়ছে।
এসবের কিছু উপকারী হলেও অনেক ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত দাবি করা হয়।
তাই চাকরিপ্রার্থীদের উচিত—
- সোশ্যাল মিডিয়ার পরামর্শ অন্ধভাবে অনুসরণ না করা।
- নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
- নিজের দক্ষতা উন্নয়নে বেশি সময় ব্যয় করা।
- এবং প্রতিটি আবেদনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুত করা।
Research Evidence
প্রকাশনা: The Conversation
লেখক: গবেষক, Mount Royal University এবং University of Calgary
প্রকাশের সময়: জুলাই ২০২৬
মূল গবেষণালব্ধ বার্তা:
- “ATS 75% শতাংশ সিভি বাতিল করে দেয়” -দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
- সব ATS একইভাবে কাজ করে না।
- AI সহায়ক, কিন্তু অতিরিক্ত AI-নির্ভর আবেদন নিয়োগদাতাদের কাছে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
- সাধারণ (Generic) শত শত আবেদন পাঠানোর চেয়ে লক্ষ্যভিত্তিক, কাস্টমাইজড আবেদন বেশি কার্যকর।
শেষ কথা
চাকরি খোঁজার জগতে শর্টকাটের প্রতিশ্রুতি অনেক, কিন্তু গবেষণা আমাদের ভিন্ন কথা বলে।
একটি ভালো সিভি গুরুত্বপূর্ণ, AI-ও সহায়ক, ATS-ও বাস্তবতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বাড়ে তখনই, যখন আপনি নিজের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিত্বকে সৎ, স্পষ্ট ও প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন।
মনে রাখবেন—চাকরি পেতে কৌশল দরকার, কিন্তু সেই কৌশলের ভিত্তি হতে হবে তথ্য, গবেষণা এবং বাস্তবতা; গুজব বা ভাইরাল পরামর্শ নয়।
এধরনের আরো চমৎকার লেখা পড়তে আপনার ইমেইল সাবমিট করুন-







