আমি যখন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পড়তাম, তখন প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখতাম, বাবা বাসায় আছেন এবং আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। স্কুল শেষে আমরা প্রায়ই একসঙ্গে নাস্তা করতে করতে দীর্ঘ সময় গল্প করতাম।
আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, সেই “আলাপ” ছিল আমার ব্যক্তিগত “সফট স্কিল বিশ্ববিদ্যালয়”।
সেই আলাপচারিতার মধ্য দিয়েই আমি শিখেছিলাম, “কখনো সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলো না।” আমি শিখেছিলাম একটি হাসির শক্তি, কঠোর পরিশ্রমের মূল্য এবং এই উপদেশও বহুবার শুনেছি—“কখনো স্কাঙ্কের সঙ্গে প্রস্রাবের প্রতিযোগিতায় নামবে না!” (অযোগ্য মানুষের সঙ্গে তর্কে জড়িও না)।
[স্কাঙ্ক (Skunk) হলো উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া এক ধরনের ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী। এটি দেখতে অনেকটা বিড়াল বা বেজির মতো, সাধারণত কালো রঙের গায়ে সাদা ডোরা বা দাগ থাকে। Skunk-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, বিপদের সম্মুখীন হলে এটি তার শরীরের পেছনের গ্রন্থি থেকে অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত এক ধরনের তরল ছিটিয়ে শত্রুকে প্রতিহত করে। এই গন্ধ এতটাই তীব্র যে অনেক প্রাণী এবং মানুষও এর কাছ থেকে দূরে সরে যায়।]
আমার বাবা কলেজে পড়ার খরচ চালিয়েছিলেন একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে তাঁর কিছু বিশেষ কৌশলও ছিল। তিনি বলতেন—
“সবসময় নিশ্চিত করবে যে বেসিনগুলো পরিষ্কার এবং কলগুলো চকচকে থাকে। সময়ের অভাবে অন্য কিছুতে একটু কম মনোযোগ দিলেও চলবে, কিন্তু মানুষ বেসিনের অবস্থা খুব দ্রুত লক্ষ্য করে।”
তিনি আমাকে আরও শিখিয়েছিলেন, স্কুলের প্রত্যেক মানুষকে সম্মান করতে—বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের।
এই শিক্ষার গুরুত্ব আমি অনুভব করি যখন কলেজ জীবনে একটি শহরের হাইস্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করতাম। আমি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতাম, আর তারাও ছাত্রদের ব্যাপারে আমাকে সহযোগিতা করতেন। ফলে খুব দ্রুত ছাত্ররাও আমাকে আপন করে নেয়।
তখন আমরা “সফট স্কিল” শব্দটির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। কিন্তু বাবার কাছ থেকে পাওয়া এসব ছোট ছোট জীবন-জ্ঞানই আমাকে পরবর্তীতে পড়াশোনার দক্ষতা (Study Skills) নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, পড়াশোনা ও জীবনকে আরও ভালোভাবে পরিচালনা করার নিশ্চয়ই আরও কার্যকর উপায় আছে।
আপনি একে যাই বলুন না কেন—সফট স্কিল, স্টাডি স্কিল কিংবা লাইফ স্কিল—মূল বিষয় একটাই। এগুলো হলো কৌশলের মাধ্যমে নিজের জীবনকে পরিচালনা করার দক্ষতা।
কয়েক মাস আগে আমার ফাইল ক্যাবিনেট গোছাতে গিয়ে বাবার হাতের লেখায় লেখা কিছু নোট খুঁজে পাই। জানি না কেন তিনি সেগুলো লিখেছিলেন। হয়তো তিনি তাঁর কোনো ভাতিজার স্নাতক সম্পন্ন করার সময় উপহার দিতে চেয়েছিলেন, অথবা হয়তো আমার দুই ভাই এবং আমাকে দেওয়ার জন্যই লিখেছিলেন।
যাই হোক, আমি সেগুলো এখন আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করে নিচ্ছি।
দেখতে এগুলো খুব সাধারণ কিছু কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবচেয়ে সহজ শিক্ষাগুলোই আমরা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষা করি।
বাবা ক্রুগারের জীবনবোধের সেরা কিছু শিক্ষা
- যদি তুমি বিশ্বাস করো যে তুমি পারবে, তাহলে তুমি পারবেই।
- যদি তুমি মনে করো যে তুমি পারবে না, তাহলে সম্ভবত তুমি পারবে না।
- লক্ষ্য নির্ধারণ করো এবং সেগুলোকে মনের চোখে স্পষ্টভাবে কল্পনা করো।
- ইতিবাচক চিন্তা করো। নেতিবাচক ভাবনায় সময় ও শক্তি নষ্ট করো না।
- তুমি নিজেকে যেমন ভাবো, তুমি অনেকটাই তেমন হয়ে ওঠো।
- এমন কাউকে অনুসরণ করো, যাকে তুমি শ্রদ্ধা করো এবং তার মতো হওয়ার চেষ্টা করো। (বাবার আদর্শ ছিলেন তাঁর দাদা। তিনি বলতেন, “তাঁর কাছে কখনো দুটো পয়সাও একসঙ্গে ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।”)
- কোনো সমস্যা হলে নিজেকে জিজ্ঞেস করো—“আমি কি কোনো ভুল করেছি? আমি কি কাউকে কষ্ট দিয়েছি?” যদি করে থাকো, তাহলে ভুল সংশোধন করো এবং ক্ষমা চাও। আর যদি বিষয়টি তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে হয়, তাহলে বলো—“যা হয়েছে, হয়েছে”—এবং সামনে এগিয়ে যাও।
- তোমার প্রিয় বা পরিচিত কেউ মারা গেলে, তার যে গুণগুলো তুমি শ্রদ্ধা করতে, সেগুলো নিজের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করো।
- নতুন কিছু চেষ্টা করতে ভয় পেয়ো না। নতুন অভিজ্ঞতা মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে। একসময় সেটিই সহজ হয়ে যায় এবং দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত হয়। (আজও প্রযুক্তি শেখার ব্যাপারে বাবার আগ্রহ আমাকে অনুপ্রাণিত করে।)
আজই এমন একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করুন, যাকে আপনি শ্রদ্ধা করেন—
”আপনি এখন এমন কী জানেন, যা আপনি চাইতেন, তরুণ বয়সেই যদি জানতে পারতেন?”
এই সফট স্কিলগুলো মোটেও ‘নরম’ বা তুচ্ছ কিছু নয়। এগুলো বাস্তব জীবনের দক্ষতা। আর সফল জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে এই শিক্ষার ওপরই।
লেখক: সুসান ক্রুগার উইন্টার, এম.এডি.
এধরনের আরো চমৎকার লেখা পড়তে আপনার ইমেইল সাবমিট করুন-

