বিজ্ঞাপন ছাড়াই মাত্র এক মাসে ২৫ লাখ টাকা আয় করেছি যেভাবে

0
275
এক মাসে ২৫ লাখ টাকা আয় করেছি যেভাবে

টাইটেলটা আমাদের ইউট্যুবারদের মতো চটকদার হলেও ঘটনাটা আসলেই সত্যি। এবার আমরা এক টাকা বিজ্ঞাপন খরচ ছাড়াই মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকার মতো রেভিনিউ জেনারেট করেছি। অনলাইন ব্যবসা যারাই করেন, জানেন, এখন ফেসবুকে পানির মতো টাকা ঢালতে হয়, তারপরও কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট পাওয়া যায় না। এরপর যারা আরেকটু আপগ্রেড, তারা এসইও-তে টাকা ঢালেন, গুগলে অ্যাড দেন, হালের ইনফ্লুয়েন্সারদেরকে দিয়ে স্পন্সরড কন্টেন্ট বানান, এসএমএস মার্কেটিং করেন। এই সবগুলোতে অনেক অনেক টাকা ঢালতে হয়। এর কোনকিছুতেই কোনো ধরনের খরচ ছাড়াই পুরোপুরি অর্গানিক ওয়েতে আমরা এই স্বল্প সময়ে এই পরিমাণ রেভিনিউ জেনারেট করতে সক্ষম হয়েছি আল্লাহর অশেষ রহমতে।

পেছনের কারণ বা টেকনিকগুলো বিজনেস সিক্রেট হলেও উপকারের নিয়্যতে সকলের সাথে শেয়ার করছি। আর্টিকেলটা থেকে উপকৃত হলে আমাদের জন্য দুয়া করতে ভুলবেন না কিন্তু। চলুন শুরু করা যাক।

১) প্রোডাক্ট সিলেকশন

প্রথমত প্রোডাক্টটা ছিলো হাই ভ্যালুড এবং সিজনাল একটা প্রোডাক্ট। চাহিদা ছিল অনেক বেশি, স্বল্প সময়ে ভালো একটা রেভিনিউ জেনারেট করা গেছে। গতবারের ধারাবাহিকতায় এবারও কোরবানির ঈদে আমরা গরু বিক্রি করে এই পরিমাণ রেভিনিউ জেনারেট করেছি।

মার্কেটিং, ট্রানজেকশন ও ডেলিভারির জন্য আমরা অনলাইনের সহযোগিতা নিলেও এটাকে ঠিক অনলাইন সেল বলা যাবে না। ঢাকার বুকে বসিলাতে আমরা একটা গরুর খামার দিয়েছি যেখানে কাস্টমাররা সরাসরি এসে, দেখেশুনে, নেড়েচেড়ে গরু পছন্দ করেছেন, বুক করেছেন। উচ্চমূল্যের, উচ্চচাহিদার ও সিজনাল একটা প্রোডাক্ট হওয়ায় এতো কম সময়ে এতো ভালো রেভিনিউ জেনারেট করতে আমরা সক্ষম হয়েছি।

২) নো শর্টকাট

অন্য অনেকের মতো ঢাকার বাইরে গরু রেখে ছবি বা ভিডিও করে আমরা গরু বিক্রি করে ঈদের আগের দিন ডেলিভারি করতে পারতাম, কিন্তু আমরা সে শর্টকাট পথে এগুইনি। আমরা চেয়েছি কাস্টমারদের অনলাইন ও অফলাইনের ব্লেন্ডেড একটা অভিজ্ঞতা উপহার দিতে। যতো কম ভিজিটে, কম হ্যাসেলে একটা দারুণ পারচেজ এক্সপেরিয়েন্স উপহার দেয়া যায় সেই চেষ্টা ছিল আমাদের।

অনলাইনে ছবি দেখে গরু কিনে ফাইনালি প্রোডাক্ট হাতে পাওয়ার পর অসন্তুষ্ট কাস্টমার যেমন আমরা চাইনি, তেমনি চাইনি হাট থেকে গরু কেনার মতো হ্যাসেল, হাসিল ও বিড়ম্বনার স্বীকার হোক আমাদের কাস্টমাররা।

অনলাইনে আমরা মার্কেটিং করেছি, স্টোরি শেয়ার করেছি, সেখান থেকে লিড জেনারেট হয়েছে, কাস্টমারদের অনুরোধ করেছি সুবিধামতো সময়ে অন্তত একদিন এসে গরু পছন্দ করে যেতে, এরপর পেমেন্ট, ডেলিভারি সবকিছুই করা হয়েছে অনলাইনে, কাস্টমারের ফারদার ভিজিট ছাড়াই।

কাস্টমাররা সরাসরি ভিজিট করায় যেটা হয়েছে, তাদের সাথে আমাদের ইন্ট্যারাকশানটা ভালো হয়েছে, আমাদের প্রোডাক্টের ডিটেইল তাদের কাছে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছি, কমিউনিকেশন গ্যাপ দূর হয়েছে।

ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শতাধিক গরু বিক্রি করা একভাই পরামর্শ দিচ্ছিলেন যে, এভাবে প্রোডাক্ট বেচলে স্কেল আপ করতে পারবো না। আমাদের যুক্তি হলো, ১০০ টা প্রোডাক্ট বেচে ২০ টা ডিসস্যাটিসফাইড ক্লায়েন্ট পাওয়ার চেয়ে ২০ টা ৩০ টা প্রোডাক্ট বেচে শতভাগ সন্তুষ্ট ক্লায়েন্ট পাওয়া অনেক ভালো। সব জিনিসের স্কেল আপ ভালো না, হয় না। ঈদের গরু পুরোপুরি অনলাইন থেকে শর্টকাটে কেনা গ্রাহকদের জন্যও যেমন ভালো না, তেমনি সেলারদের জন্যও ভালো না।

৩) প্রোডাক্ট কোয়ালিটি

অনলাইন, সার্ভিস, কন্টেন্ট; যে যতো কথাই বলুক আল্টিমেটলি, ‘প্রোডাক্ট ইস দ্যা কিং’। প্রোডাক্টের ব্যাপারে আমি একটা কথা সবসময়ই বলি-
“এমন প্রোডাক্ট করিবে গঠন,
লুকাইবে তুমি, খুঁজিবে কাস্টমারজন।”

বাজারের স্টেরয়েড, ফিড, ইউরিয়া খাওয়ানো বিদেশী ব্রিডের গরুর বিপরীতে আমাদের প্রাকৃতিক খাবারে বড় হওয়া সুস্থ, প্রাণচঞ্চল, ছোটখাটো দেশী গরু প্রায় বিরল বলা চলে। এ গরুগুলোর অসাধারণ স্বাদ ও মানবশরীরের জন্য নিরাপদ হওয়ায় কাস্টমারদের মধ্যে তা ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। আর গরুগুলো ডেভেলপ করার জন্য আমরা ‘পরিচিত বিশ্বস্ত ভাই’, ‘গ্রামের গৃহস্থ’ এদের উপর নির্ভর করিনি, গরু কেনার পর লম্বা একটা সময় নিজেরা স্বহস্তে বড় যত্নের সাথে লালন করেছি। আমাদের গরুর ব্যাপারে তাই শতভাগ আত্মবিশ্বাসের সাথে আমরা কাস্টমারদের ব্রিফ করতে পেরেছি।

আমাদের অভিজ্ঞতায় বলে, এদেশের অধিকাংশ মানুষ ফিড, ইউরিয়াকে খারাপ কিছু মনে করে না, হয়তো অতোটা খারাপ নয়ও, কিন্তু আমরা যে স্কুল অফ থট ফলো করি, তাতে সকল ধরনের অপ্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ব্যবহারের বিপক্ষে আমরা। কেমিক্যাল ছাড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যেরকম গরু পাওয়া যায় আমরা তাতেই সন্তুষ্ট, এতে গরুর গ্রোথ কম হোক বা দেখতে যতো খারাপই দেখাক, আমরা প্রকৃতির বাইরে যেতে চাই না। এজন্য এরকম গরু ডেভেলপ করার জন্য নিজে লালন করার বিকল্প নেই। অন্যের হাতে পড়লেই তাতে অহেতুক কেমিকেল ও ফিডের প্র‍য়োগ হতে পারে। আমাদের প্রোডাক্টের এই অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের এতো সহজে কোন পেইড এ্যাড ছাড়া অর্গানিক ওয়েতে এতো ভালো সেল এনে দিতে সাহায্য করেছে।

৪) পারসোনাল ব্রান্ডিং

আসলে একমাসের কম সময়ে সেলটা হলেও এর পেছনে ছিলো দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, তিল তিল করে গড়ে তোলা পারসোনাল ব্রান্ডিং। আমাদের শেডে এক ছোটভাই অনেকগুলো গরু তুলেছিল, আমরা তার গরুগুলো লালন করে দিয়েছি একদম সেইম আমাদের পদ্ধতিতে, সে-ও অনলাইন অফলাইনের ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে সেল করেছে, অর্থ্যাৎ অন্য সব ফ্যাক্টর আমাদের মতোই ছিল, কিন্তু তার গরুগুলো বেচতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে, শেষ পর্যন্ত কিছু গরু হাটেও উঠাতে হয়েছে। দুইজনের সেলস এ পার্থক্য গড়ে দিয়েছে এই পারসোনাল ব্রান্ডিং।

অনলাইনে লেখালিখি, ফোরামে সময় দেয়া, ইনবক্সে কানেকশন রাখা- এগুলোকে অনেকে অহেতুক মনে করে, সময় নষ্ট করা ভাবে। কিন্তু বর্তমানে এগুলোর মনিটারি ভ্যালু রয়েছে। এগুলো আপনার পারসোনাল ব্র্যান্ডিং গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

অনেকে পারসোনাল ব্র্যান্ডিং বলতে ভাবেন, ফেসবুকে শুধু তেল, চিনি, মধু, আমের অনবরত বিজ্ঞাপন, শুধু এগুলো নিয়েই বলতে হবে। সবসময় এক টপিক নিয়ে বলতে থাকলে কাস্টমার বিরক্ত হবে, আপনার পোস্ট পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। আপনার যে বিষয়ে এক্সপার্টিজ আছে বা যে সেগমেন্টে ব্যবসা করছেন, সেগুলো নিয়ে লিখুন, নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকারের নিয়্যতেই লিখুন। এই লেখাগুলো সদকায়ে জারিয়া হিসেবেও থাকবে, সাথে গড়ে উঠবে আপনার সুন্দর একটা পারসোনাল ব্র্যান্ডিং।

৫) নেটওয়ার্ক, নেটওয়ার্ক এবং নেটওয়ার্ক

একটা ব্যবসার সবচেয়ে বড় অ্যাসেট আমি মনে করি এই নেটওয়ার্ক। আপনার নেটওয়ার্ক যতো ভালো, আপনার ব্যবসা করার পরিধি ততো বড়। এটাকে আমি এভাবে বলি- “আপনার ব্যবসার পরিধি আপনার নেটওয়ার্কের সমানুপাতিক”।

নেটওয়ার্ক বাড়াতে অনলাইন এক্টিভিটির পাশাপাশি অফলাইনেও কানেকশন বাড়াতে হবে। ছোটবেলার বন্ধু, স্কুল, কলেজের রিইউনিয়ন, স্পোর্টস কমিউনিটি, প্রফেশনালদের আড্ডা- এগুলো মিস করা চলবে না। যতো মিশবেন, ঘুরবেন, সময় দিবেন, স্পন্সর করবেন ততো আপনার নেটওয়ার্ক বড় হবে, ব্যবসা করার পরিধি, সুযোগ বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

পরিশেষে বলতে চাই, নিজের বড়ত্ব জাহির করা বা ব্যবসায়ের মার্কেটিং করা লেখাটার উদ্দেশ্য নয়, বরং নিজের কেসস্টাডি অন্যের সাথে শেয়ার করা উপকারের নিয়তে। আমাদের এই লেখাগুলো আমাদের  অ্যাসেট, সদাকায়ে জারিয়ার উৎস। আমরা একসময় থাকবো না, কিন্তু আশা রাখি অন্যের পাশাপাশি আমরাও এই লেখাগুলো থেকে উপকার পেতে থাকবো। অন্যরা কন্টেন্টের শেষে চায় লাইক, শেয়ার, আমরা চাই আপনাদের দু’আ। লেখাটি থেকে বিন্দুমাত্র উপকৃত হলে আমাদের জন্য দু’আ করতে ভুলবেন না কিন্তু। ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য। জাজাকুমুল্লাহ খায়ের।

ঘোষণা

আপনিও লিখুন


প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্সে। শিক্ষা, ক্যারিয়ার বা পেশা সম্পর্কে যে কোনো লেখা আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। পাঠাতে পারেন অনুবাদ লেখাও। তবে সেক্ষেত্রে মূল উৎসটি অবশ্যই উল্লেখ করুন লেখার শেষে। লেখা পাঠাতে পারেন ইমেইলে অথবা ফেসবুক ইনবক্সে। ইমেইল : [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here