ফ্রিল্যান্সিং : ঘরে বসে বিদেশি কাজ

ফ্রিল্যান্সিং : ঘরে বসে বিদেশি কাজ

পড়াশুনার পাশাপাশি কিংবা পড়াশুনা শেষে প্রচলিত চাকরির বাজারে না ছুটে যে কেউ ইচ্ছে করলেই গড়তে পারেন ফ্রিল্যান্সার বা আউটসোসোর্সার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার। তবে সেজন্য দরকার প্রযুক্তি জ্ঞান। গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, প্রোগ্রামিং প্রভৃতি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন একজন পেশাদার ফ্রিল্যান্সার বা আউটসোর্সার। বর্তমান বাজারে  দিনদিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং। ফ্রিল্যান্সিং কী এবং কীভাবেই বা শুরু করবেন এ পেশা? সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানাচ্ছেন নাজমুস সাকিব

ফ্রিল্যান্স বা মুক্ত পেশা কী?

গতানুগতিক চাকরির বাইরে নিজের ইচ্ছেমত কাজ করার নামই ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্ত পেশা। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা যায়। যেমন- ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার, ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার ইত্যাদি। মোটকথা কোথাও চাকরি না নিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো কোন কাজ করে যিনি জীবীকা নির্বাহ করেন তাকেই বলা হয় ফ্রিল্যান্সার বা মুক্ত পেশাজীবি। আর দেশে বসে অন্য কোন দেশের কোন প্রতিষ্ঠানের কাজ করে দেয়ার নাম আউটসোসিং। একজন পেশাজীবী যেমন নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করার স্বাধীনতা পান ঠিক তেমনি বিভিন্ন কাজের মধ্যে যে কাজটিতে তিনি দক্ষ সেটি বাছাই করার সুযোগও পান।

একজন ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সার দিন, ঘণ্টা, প্রজেক্ট বা সেবার ভিত্তিতে কাজ করে উপার্জন করেন বৈদেশিক মুদ্রা। বাইরের দেশগুলো কম মূল্যে কাজ করানোর জন্যই মূলত আউটসোর্সিং করে থাকে। উন্নত দেশগুলো সফটওয়্যার তৈরি বা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কাজগুলো  ইন্টারনেটের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশ থেকে অল্প খরচে করিয়ে নেয় এই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে।  তুলনামূলক কম পারিশ্রমিক থাকায় উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও আউটসোর্সিং শিল্পে দ্রুত উন্নতি করে চলছে। বর্তমানে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নয়, ব্যক্তিগতভাবেও আউটসোর্সিং ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে  আবেদনপত্র পূরণ করে বা নিবন্ধন করে  আউটসোর্সিংয়ের কাজ পাওয়া সম্ভব। তবে প্রথম অবস্থায় কাজ পাওয়া কঠিন হলেও ধৈর্য সহকারে এগোলে আপনি ঠিক পছন্দসই কাজটি পেয়ে যাবেন। তবে এ ক্ষেত্রে দক্ষতার বিকল্প নেই। আপনাকে অবশ্যই যে কোন একটি বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। যেমন ধরুন, আপনি লেখালেখিতে দক্ষ হতে পারেন  অথবা ডিজাইনার হিসেবেও  নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন। আবার নতুন নতুন প্রোগাম তৈরি করেও অর্থ আয় করতে পারেন অনায়াশে। তবে প্রশিক্ষণ ও এ বিষয়ে অধ্যবসায় চালিয়ে যেতে হবে ।

ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস

ইন্টারনেটে যে ওয়েবসাইট ফ্রিল্যান্স সার্ভিস দেয় তাদেরকে বলা হয় ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস। এই সাইটগুলোর যে কোনো একটিতে রেজিস্ট্রেশন করে শুরু করতে পারেন আউটসোসিং।
এখানে দুটি পক্ষ কাজ করে। যারা এসব সাইটে কাজ দেয় তাদের বলা হয় বায়ার বা ক্লায়েন্ট। আর যারা এই কাজগুলো সম্পন্ন করে তাদের বলা হয় কোডার বা প্রোভাইডার। কোডার একটি কাজের জন্য বা প্রজেক্টের জন্য বিড বা আবেদন করে । কত দিনের মধ্যে প্রজেক্ট জমা দিতে হবে, কত টাকায় তা সম্পন্ন করতে হবে সব বিষয় পরিষ্কার উল্লেখ থাকে। কোডাররা আবেদন করার পর ক্লায়েন্ট যাকে ইচ্ছা তাকে কাজটির জন্য নির্বাচন করতে পারে। ক্লায়েন্ট  সাধারণত কোডারের পূর্ব অভিজ্ঞতা, বিড করার সময় কোডারের মন্তব্য ইত্যাদি বিষয় বেশ গুরুত্বের সাথে দেখে। কোডার নির্বাচিত হবার পর ক্লায়েন্ট কাজের টাকা সাইটগুলোতে জমা করে দেয়। কোডার কাজ শেষ করার সাথে সাথে  টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে যান।
যে সাইটির মাধ্যমে কাজটি পাওয়া গেছে সে সাইটটি নির্দিষ্ট কমিশন রেখে বাকি টাকা কোডারের অ্যাকাউন্টে জমা করে দেয়।

কী কাজ করতে হয়?

ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোসিংয়ে মূলত যেসব কাজ পাওয়া যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-
Article Writing, Proof Reading, Translation, Forum Posting, Blog Commenting, Review Writing, Editing, newsletter.

ডাটা এন্ট্রি : এ ক্ষেত্রে দু’রকম কাজ করা যায়। অনলাইনে সরাসরি কাজটি করা। বা অফলাইনে কাজটি করে তা জমা দেয়া। এখানে Directory Submission, Social bookmarking, Data processing, Virtual assistant, Transcription ইত্যাদি কাজ পাওয়া যায় ।

Graphic Design: এখানে Banner, Logo, Icon, Templates, Website Designing প্রভৃতি কাজ পাওয়া যায়।
Mobile & Computing: Iphone, Blackberry, Android, Symbian, Windows Mobile -এর Applications, Software তৈরি করার কাজ পাওয়া যায়।

অনলাইন সার্ভে : বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি তাদের পণ্য কেমন চলবে তার জরিপ অনলাইনে করিয়ে নেয়। এখানেও প্রতি সার্ভেতে ভালো টাকা উপার্জন করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে আপনার ভাষাগত  দক্ষতা   বেশি  প্রয়োজন ।
এছাড়া প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, কাস্টমার কেয়ার, কলসেন্টার, থ্রিডি এনিমেশন, গেম তৈরি প্রভৃতি কাজও পাওয়া যায় এর মাধ্যমে।

যেভাবে শুরু করবেন ফ্রিল্যান্সিং

নিচে বেশ কিছু ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেয়া হলো। সাইটগুলোতে ভিজিট করুন এবং সম্ভব হলে অ্যাকাউন্ট তৈরি করে ফেলুন। এরপর যে সাইটটি আপনার কাছে ভালো লেগেছে সে সাইটে কাজের জন্য বিট (আবেদন) করতে পারেন। ভিন্ন ভিন্ন সাইটে রয়েছে হরেক রকম কজের সমারহ। এর মধ্য থেকে যে কাজগুলোতে আপনি বেশি দক্ষ বলে মনে করেন সে কাজগুলোর জন্য আবেদন করুন ।
www.freelancer.com
www.upwork.com
www.Joomlancers.com
www.GetAFreelancer.com
www.RentACoder.com

আবেদনের পূর্ব প্রস্তুতি

– শুরুতেই ভালো একটা কাভার লেটার তৈরি করুন যা আপনার ক্লায়েন্টের কাছে আবেদনের সময় লাগবে।
– আগের কাজের লিস্ট বা একটি ভালো পোর্টফলিও তৈরি করুন। মূলত এই পোর্টফলিও বা কাজের অভিজ্ঞতা দেখেই একজন ক্লায়েন্ট কাজের জন্য আপনাকে নির্বাচন করবে।
– পোর্টফলিওতে আপনার যে বিষয়ে দক্ষতা আছে তা ভালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করুন।
– কোন মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে যে বিষয়টিতে আপনার দক্ষতা আছে শুধু তাই প্রকাশ করুন।
আবেদন করুন ভেবেচিন্তে
– পোর্টফলিওতে বিশাল লিস্ট না দিয়ে যে বিষয়ে ইতিপূর্বে কাজ করেছেন শুধু তা অন্তর্ভুক্ত করুন।
– কাজটি ঘণ্টায় না দিনে তা আগেই জেনে নিন। যদি দিনে হয় তাহলে তা কত দিনের মধ্যে তাও জেনে নিন।
– সতর্ক থাকুন যে ক্লায়েন্টের কাজ করছেন তার কোন রিভিউ আছে কি না। কারণ অনেক সময় ক্লায়েন্ট প্রতারক হতে পারে। কাজ শেষে টাকা না দেয়ার ক্লায়েন্টও আছে ।

কাজ শেষে যেভাবে টাকা আনবেন

যেকোন প্রজেক্টের কাজ শেষে  আপনি বিভিন্ন মাধ্যমে টাকা পেতে পারেন। তবে প্রত্যেকের ধরন একই রকম। এর মধ্যে আপওয়ার্ক এবং ফ্রিল্যান্সার সাইট যে পদ্ধতিগুলো সাপোর্ট করে তার মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে-
– মাস্টার কার্ড
– মানি বুকার্স
– ওয়ারট্রান্সফার
– পেপাল (বর্তমানে আমাদের দেশে এর সুবিধা চালু হয়নি। তবে এর মাধ্যমে অনলাইন মার্কেটে কেনাকাটা  করতে পারবেন )

যে সাইটের মাধ্যমে আপনি কাজ করেছেন বা যে সাইটে আপনার অ্যাকাউন্ট আছে সেসব সাইট থেকে যদি ২০/৩০ ডলার আয় করে থাকেন, তাহলে আপনি কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট সাইটের লিংকে এ সংক্রান্ত নিয়মগুলো দেখতে পারেন ।

ফ্রিল্যান্সিং -এ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস সাইটে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা ভালোভাবে না জানার কারণে অনেকে সফলভাবে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে পারেন না। নিচে এরকম কয়েকটি বিষয় আলোকপাত করা হলো।

রেটিং (Rating)
একটি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ক্লায়েন্ট কাজের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে প্রোভাইডারকে ১ থেকে ১০ এর মধ্যে রেটিং দেয়। এখানে সর্বোৎকৃষ্ট রেটিং হচ্ছে ১০ এবং সর্বনিম্ন রেটিং হচ্ছে ১। নতুন কাজ পাবার ক্ষেত্রে এই রেটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সবসময় ১০ রেটিং পাওয়ার জন্য প্রজেক্টের চাহিদাগুলো পূর্ণভাবে ও দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করা উচিত।

র‌্যাংকিং (Ranking)
একটি ফ্রিল্যান্সিং সাইটে রেজিষ্ট্রেশনকৃত সকল প্রোভাইডারের মধ্যে একজন নির্দিষ্ট প্রোভাইডারের অবস্থান কত তা জানা যায় র‌্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। সাধারণত একজন প্রোভাইডারের গড় রেটিং ও সে কত বেশি ডলারের কাজ করেছে তার ওপর ভিত্তি করে র‌্যাংকিং করা হয়। রেটিং-এর মতো র‌্যাংকিংও নতুন কাজ পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রখে। যার র‌্যাংকিং যত সামনের দিকে তার কাজ পাবার সম্ভাবনা অন্যদের চাইতে তত বেশি।

ডেডলাইন (Deadline)
প্রত্যেক প্রজেক্ট শেষ করার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইন সময় থাকে। এই সময়ের পূর্বে অবশ্যই কাজ শেষ করতে হয়। কোন প্রোভাইডার যদি ডেডলাইনের পূর্বে কাজ শেষ করতে না পারে তাহলে বায়ার ইচ্ছে করলে তাকে কোন মূল্য পরিশোধ না করে সম্পন্ন কাজটি নিয়ে যেতে পারেন। উপরন্তু ক্লায়েন্ট সেই  প্রোভাইডারকে একটি নিম্নমানের রেটিং দিতে পারে। তাই কোন প্রজেক্টের ডেডলাইন সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে কাজ শুরুর পূর্বেই বায়ারকে অনুরোধ করে বাড়িয়ে নেয়া উচিত।

মেডিয়েশন/আর্বিট্রেশন (Mediation/Arbitration)
একটি প্রজেক্ট চলাকালীন বায়ার এবং প্রোভাইডারের মধ্যে কোন সমস্যা হলে তা সমাধানের জন্য মেডিয়েশনের ব্যবস্থা আছে। এ পদ্ধতিতে সাইটের যথাযথ কতৃপক্ষ উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা করে সমাধানের কার্যকর পদক্ষেপ নেন।

এসক্রো (Escrow):
কাজ শুরু করার পর ক্লায়েন্ট কাজের সম্পূর্ণ অর্থ ওই ফ্রিল্যান্সিং সাইটে জমা রাখে। এই জমা রাখাকে বলা হয় এসক্রো। যা কাজ সম্পন্ন হবার পর কোডারের টাকা পাবার সম্ভাবনা নিশ্চিত করে। ক্লায়েন্ট টাকা এসক্রোতে জমা রাখার পূর্বে কাজ শুরু করা উচিত নয়।

প্রশিক্ষণ কোর্স করতে পারেন
বিডি জবস
বিডিডিএল ভবন ৮ম তলা
কাওরান বাজার

ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট  অফ আইটি
বাড়ি -৭, রোড-১৪
২৯ ধানমন্ডি, ঢাকা
ফোন : ৯১২৪৭৭৩, ৯১৩৮১৩৯, ৯১৩৮১৪০

লক্ষণীয় কিছু দিক

– যে কোন একটি বিষয়ে পারদর্শি হয়ে উঠুন যে বিষয়ে আপনার আগ্রহ আছে।
– সততার বজায় রাখুন ।
– ক্লায়েন্টের কাছে নিজেকে নির্ভরযোগ্য করতে বাড়তি কাজ করার অভ্যাস করুন।
– প্রজেক্টের খবরা-খবর  জানাতে নিয়মিত ক্লায়েন্ট এর সাথে যোগাযোগ করুন।
– নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করার চেষ্টা করুন যেন ডেডলাইন মিস না হয়। কখনো ডেডলাইন মিস করলে পরবর্তিতে কাজ পাওয়াটা আরো কঠিন হতে পারে ।
– ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ান।
–  ইন্টারনেট সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখুন।
–  ভালো রেটিং পাওয়ার জন্য প্রচণ্ড পরিশ্রম করার মানসিকতা রাখুন।
– প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পরিমাণ কাজ করার মানসিকতা তৈরি করুন।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু ওয়েবসাইট
ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে  আরো জানতে ভিজিট করতে পারেন-
freelancefolder.com
www.allfreelance.com/freelancing_blog
www.odesk.com/community
www.freelancermagazine.com
freelancerstory.blogspot.com (বাংলা)

2 thoughts on “ফ্রিল্যান্সিং : ঘরে বসে বিদেশি কাজ”

Comments are closed.

ক্যারিয়ার, ট্রেনিং ও স্কলারশিপ সম্পর্কে
exclusive তথ্য পেতে ফেসবুক গ্রুপে
জয়েন করুন-

Career Intelligence | My Career Partner

Scroll to Top