সিভিতে কিভাবে আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা উল্লেখ করবেন?

0
40
আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা কী? সিভিতে কিভাবে এ দক্ষতা উল্লেখ করবেন?

আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা হচ্ছে- যেভাবে মানুষের সাথে আপনি যোগাযোগ ও মিথস্ক্রিয়া করেন।  এগুলোকে সফট স্কিল, পিপল স্কিল বা ইমোশনাল ইনটেলিজেন্স নামেও অভিহিত করা হয়।

এই নিবন্ধে আলোচনা করবো আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতার বিভিন্ন দিক নিয়ে। আশা করছি নিবন্ধটি আপনার ভালো লাগেবে এবং এ বিষয়ে আপনার জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে সাহায্য করবে। 

আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতার সংজ্ঞা 

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা হচ্ছে মানুষের সাথে যোগাযোগ ও মিথস্ক্রিয়ার পদ্ধতি। এর সংজ্ঞায় ইনভেস্টোপিডিয়া ডটকম লিখেছে-

Interpersonal skills are the behaviors and tactics a person uses to interact with others effectively. People use interpersonal skills all the time when dealing with others, whether in the workplace, in social situations, or within a family.

অর্থাৎ আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা হলো এমন আচরণ এবং কৌশল যা একজন ব্যক্তি অন্যদের সাথে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে ব্যবহার করেন। কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক পরিস্থিতিতে বা পরিবারের মধ্যে অন্যদের সাথে আচরণ করার সময় লোকেরা সর্বদা আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা ব্যবহার করে।

collinsdictionary.com লিখেছে- skills that contribute to dealing successfully with other people. 

অর্থ্যাৎ,  এমন দক্ষতাসমূহ যা অন্য লোকেদের সাথে সফলভাবে আচরণ করতে অবদান রাখে।

উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েেছে- Interpersonal skills are actions used to effectively interact with others. যার মানে হচ্ছে- আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা অন্যদের সাথে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করার জন্য ব্যবহৃত ক্রিয়া।

উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়- আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা হলো এমন আচরণ যা কর্মক্ষেত্রে, স্কুলে বা বৃহত্তর অঙ্গনে আপনাকে অন্যদের সাথে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে। সক্রিয়ভাবে শোনা, সহমর্মিতা, উদারতা ইত্যাদি  উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতার উদাহরণ 

আগেই বলেছি Interpersonal Skills হচ্ছে মানুষের সাথে কার্যকর যোগাযোগের কৌশল ও আচরণ। কর্মক্ষেত্রে দুর্দান্ত ফলাফলের দিকে পরিচালিত করতে পারে এমন ধরণের দক্ষতার মধ্যে রয়েছে-

  • পরিষ্কার যোগাযোগ; যখন আপনি একটি বিষয় ব্যাখ্যা করছেন অথবা ব্যক্তিগতভাবে, লিখিতভাবে বা ফোনে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছেন
  • মনোযোগ ও সাবধানতার সাথে শ্রবণ
  • আপনি সহকর্মী বা গ্রাহকের কাছ থেকে যা শুনেছেন তা আপনি বুঝতে পেরেছেন তা নিশ্চিত করা
  • সহানুভূতিশীল আচরণ যা দেখায় যে আপনি একজন সহকর্মীর পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছেন এবং তার প্রতি যত্নশীল
  • সহকর্মীদের দরকারী ধারণা এবং সৎ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা
  • অন্যদের থেকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানো
  • একটি কাজ সম্পন্ন করার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ
  • সম্পর্ক গড়ে তোলা
  • ইতিবাচক হওয়া ইত্যাদি

নিয়োগদাতাদের পছন্দনীয় আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতার তালিকা

আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতাকে কখনও কখনও নিয়োগযোগ্য দক্ষতা বা employability skills বলা হয়। এগুলি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে নিয়োগকারীরা এসব দক্ষতা না থাকলে প্রার্থীদের নিয়োগ করতে চান না।

  • সক্রিয় শ্রবণ (Active listening)
  • দৈহিক ভাষা (Body language)
  • অকপটতা বা খোলামেলা স্বভাব (Openness) 
  • আলাপ-আলোচনা বা দর কষাকষির দক্ষতা ( Negotiation skills)
  • ইতিবাচক মনোভাব ( Positive attitude)
  • দলবদ্ধ কাজ (Teamwork)
  • সহমর্মিতা (Empathy)
  • ক্রিটিক্যাল থিংকিং Critical thinking
  • আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা বা ইমোশনাল ইনটেলিজেন্স ( Emotional intelligence)
  • দৃঢ়তা (Assertiveness) 
  • দায়িত্বশীলতা (Responsibility) 
  • কার্যকর যোগাযোগ (Effective communication)
  • দ্বন্দ্ব নিরসণ বা মীমাংসা (Conflict resolution)
  • সমস্যা-সমাধান (Problem-solving )

রিজিউমি-তে দক্ষতা (interpersonal skills on a resume)

কোন বৈশিষ্ট্য, দক্ষতা বা সক্ষমতা থাকলে তাকে শক্তিশালী আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা বলা যাবে? কোন দক্ষতাগুলো আপনার রিজিউমিকে শক্তিশালী করবে? আসুন প্রথমেই সেগুলো জেনে নিই।

১. যোগাযোগ দক্ষতা 
স্পষ্ট ও কার্যকর যোগাযোগ যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ মৌখিক অথবা লিখিত হতে পারে। আবার যোগাযোগ অমৌখিকও হতে পারে, যেমন- অঙ্গভঙ্গি, অভিব্যক্তি, স্বর, শারীরিক ভাষা, ইত্যাদি। আপনার যদি এই দক্ষতাগুলির কিছু অভাব থাকে তবে ইচ্ছা থাকলে আপনি সেগুলি শিখতে সক্ষম হবেন।

২. আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা
নিজেকে আপনার সহকর্মীদের জায়গায় ভাবুন। এতে আপনি খুব সহজেই তাদেরকে বুঝতে পারবেন। আপনি যদি তাদের অনুভূতি এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ, বিশ্বাস এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হন তবে আপনি সঠিক পদ্ধতির সন্ধান পাবেন।

৩. ইতিবাচক মনোভাব
নেতিবাচক মনোভাব একটি রোগ। এর ফলে আপনি একর পর এক সমস্যায় পড়তে থাকবেন। সবাই আপনার থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাবে।

অন্যদিকে একটি ইতিবাচক মনোভাব আপনাকে একজন কাঙ্খিত পার্টনার এবং স্মার্ট ব্যক্তিতে রূপান্তর করে। ইতিবাচক মনোভাবের ফলে মানুষ আপনার জন্য অনেক কিছু করবে। ইতিবাচক মনোভাব কঠিন সমস্যাগুলি অতিক্রম করার ক্ষেত্রে বিশাল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চরম পরিস্থিতিতে যারা ইতিবাচক মনোভাব রাখে তাদের বেঁচে থাকার হার বেশি।
৪. সামাজিক বুদ্ধিমত্তা 
কিছু অর্জন করতে আপনাকে মানুষের সাথে যোগাযোগ এবং তাদের সাথে সঠিকভাবে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। উচ্চ সামাজিক বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যক্তিরা এ কথা ভালোভাবে জানেন। সামাজিক বুদ্ধিমত্তা মানসিক বুদ্ধিমত্তার সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করে। এটি সমাজে কার কী ভূমিকা, সামাজিক গঠন এবং আপনার কীভাবে আচরণ করা উচিত – তা বুঝতে সহায়তা করে। এটাকে tact বা কৌশলও বলা যেতে পারে।

৫. দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনা
দ্বন্দ্ব আমাদের জীবনে অনিবার্য। আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতার মধ্যে- গঠনমূলক সমালোচনা, কাউন্সেলিং, মধ্যস্থতা, সমস্যা-সমাধান, মেনটরশিপ এবং অন্যান্য ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত; যা দ্বন্দ্ব সমাধানে সাহায্য করে। কর্মপ্রবাহের জন্য দ্বন্দ্ব এড়ানো এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা করা গুরুত্বপূর্ণ। কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে দ্বন্দ্বের কারণে আমেরিকান কোম্পানিগুলি প্রতি বছর ৩৫৯ বিলিয়ন হারায় এবং প্রায় ৩৫% কর্মশক্তি কোনো না কোনো দ্বন্দ্বে জড়িত।

৬. টিমওয়ার্ক
সহযোগিতা একটি সফল দলের অন্যতম মূল উপাদান। হয়তো কিছু কাজ কোনো ব্যক্তি দ্বারাও সম্পন্ন করা যেতে পারে কিন্তু সাধারণত, দলবদ্ধ প্রচেষ্টা তথা টিমওয়ার্ক কাজকে অনন্য পর্যায়ে নিয়ে যায়।

৭. দায়িত্বশীলতা
নিয়োগকর্তারা কাজের প্রতি সিরিয়াস এবং দায়িত্ববান ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করেন, যাদের উপর তারা নির্ভর করতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারেন, এমন কর্মীকে কেউ হারাতে চায় না। 

৮. ধৈর্যশীলতা
কিছু ক্ষেত্রে ধৈর্য দ্বন্দ্ব এড়াতে সাহায্য করে। কোনো টিম তৈরি বা কাউকে মেনটরিং করার সময় ধৈর্য প্রধান উপাদান। অনেকসময়, আগে দেয়া একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলেও, সঠিক সময়ে সেই প্রস্তাবই আবার গৃহিত হয়। সেজন্য ধৈর্যসহকারে কাজ করে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

  • উল্লিখিত দক্ষতাগুলো মূলত আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা। এগুলো যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কাজের ক্ষেত্রে খুব জরুরি। রিজিউমি বা সিভিতে দক্ষতাগুলোর সঠিক উপাস্থাপনা আপনাকে চাকরির ক্ষেত্রে অন্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে।

এবার প্রশ্ন হচ্ছে, দক্ষতাগুলো কীভাবে সঠিক পন্থায় রিজিউমিতে উল্লেখ করবেন। চিন্তার কারণ নেই, পরবর্তী পয়েন্টে সে বিষয়েই আলোচনা করবো।

কিভাবে আপনার জীবনবৃত্তান্তে আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা প্রদর্শন করবেন?

  • আপনার চাকরির অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে সংক্ষেপে দুয়েকটি উদাহরণ দিন, যেগুলো আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতাকে নির্দেশ করে। 
  • আপনার আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতার দ্বারা অর্জিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জনের কথা চিন্তা করুন।
  • আপনি যদি বিদেশী কোনো ভাষা জানেন, তা-ও উল্লেখ করুন। কেননা একাধিক ভাষা জানেন এমন লোকের অবশ্যই আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা বেশি হবে।
  • আপনি যদি বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে থেকে থাকলে তাও উল্লেখ করুন।
  • “supported”, “resolved”, “improved”, “mentored”, “solved”, “counseled”, “guided”, “encouraged”, “helped” ইত্যাদি কিওয়াওর্ড উল্লেখ করুন।
  • রিলেটড কোর্স করলে বা সার্টিফিকেট থাকলে সেটাও উল্লেখ করুন।
  • কাউকে মেনটরিং বা প্রশিক্ষণ দিলে তা-ও উল্লেখ করুন। 
  • বিতর্ক বা পাবলিক স্পিকিং-য়ের অভিজ্ঞতা থাকলে উল্লেখ করুন।
  • আপনি ব্যবহার করতে পারেন এমন টেকনিক্যাল বিভিন্ন যোগাযোগ টুলের তালিকা 

মনে রাখবেন আপনার জীবনবৃত্তান্তে “Strong interpersonal skills” লেখাই যথেষ্ট নয়। আপনাকে উদাহরণের মাধ্যমে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে হবে।

তথ্যসূত্র
১. Skill Types
২. Investopedia

ঘোষণা

আপনিও লিখুন


প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্সে। শিক্ষা, ক্যারিয়ার বা পেশা সম্পর্কে যে কোনো লেখা আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। পাঠাতে পারেন অনুবাদ লেখাও। তবে সেক্ষেত্রে মূল উৎসটি অবশ্যই উল্লেখ করুন লেখার শেষে। লেখা পাঠাতে পারেন ইমেইলে অথবা ফেসবুক ইনবক্সে। ইমেইল : [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here