কেন আমি প্রোডাকশন ব্যবসা পছন্দ করি

সাগর হাসনাত : হাতের পাঁচ আঙ্গুল কখনো সমান হয় না। একেকজন মানুষের পছন্দ, অভিরুচি ও যোগ্যতা একেকরকম। কারো ম্যানেজারিয়াল স্কিল ভালো, কারো টেকনিক্যাল স্কিল, কারোবা সেলিং স্কিল ভালো। নিজস্ব পছন্দ ও ক্যাপাবিলিটি অনুযায়ী ব্যবসা বেছে নেয়া উচিত।

খারাপ ব্যবসা, ভালো ব্যবসা বলে দুনিয়ায় কিছু নেই। মাছের ফুলকা, পটকা বেচে মানুষ টাকা কামাই করছে। সব ব্যবসাই ভালো, সব ব্যবসাই খারাপ। দেখতে হবে যেটা করতে চাচ্ছেন সেটা আপনার জন্য প্রযোজ্য কিনা, সেটাতে আপনার কোনো স্ট্রেন্থ আছে কিনা, ইউএসপি আছে নাকি। যদি থাকে তবে সেটা আপনার জন্য ভালো, না থাকলে সেই ব্যবসা খারাপ, খুব খারাপ। পাশাপাশি দুটো রেস্ট্যুরেন্ট, একই লোকেশন, একই কাস্টমার সেগমেন্ট, প্রায় একই ধরনের খাবারের মান; তারপরও দেখবেন একটা ভালো ব্যবসা করছে, আরেকটা লসে ডুবছে। যে ভালো ব্যবসা করছে, দেখবেন তার হয়তো কিছু অ্যাডভান্টেজ আছে, যেটা অন্যজনের নেই। সে হয়তো নিজেই সময় দিতে পারে, তার হয়তো মেইন বাবুর্চি, ম্যানেজার সৎ, সে সরাসরি কোম্পানি থেকে প্রোডাক্ট নেয়। ব্যবসায় নামার আগে এই স্ট্রেন্থগুলো আইডেন্টিফাই করতে হবে।

ট্রেডিং বিজনেস ভালো নাকি প্রোডাকশন, এটার নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। একেকজনের ভালো লাগা, পয়েন্ট অফ ভিউ একেকরকম। স্ট্রেন্থ একেকরকম, যেটা আগেই উল্লেখ করেছি। তবে পার্সোনালি কেউ যদি আমার পছন্দ জানতে চান, তবে আমি বলবো প্রোডাকশন। কেন আমি প্রোডাকশন ব্যবসা পছন্দ করি আজ সেটাই বলবো-

১) ইন্ট্রোভার্টনেস : আমি মনে করি আমি একজন ইন্ট্রোভার্ট মানুষ। স্টেজের পেছনে কাজ করতেই পছন্দ করি। প্রোডাকশনে নীরবে নিভৃতে কাজ করা যায়। সেলিং করতে গেলে অনেক বেশি এক্সট্রোভার্ট হতে হয়, যেটাতে আমার ল্যাকিংস আছে বলে আমার মনে হয়। তাই আমার জন্য প্রোডাকশনই পারফেক্ট ফিট বলে আমার ধারণা।

২) নিজের প্রোডাক্ট ধরার অনুভূতি : নিজের ফ্যাক্টরির বা নিজের বানানো একটা জিনিস দেখার অনুভূতিই আলাদা, আবার যদি সেটা আরেকজনের প্রয়োজন পূরণ করে বা ভ্যালু এডিশন করে, তাহলে তো কথাই নেই। নিজের একটা প্রোডাক্ট একটা সন্তানের মতো। সন্তানকে কেউ ভালো বললে যেমন ভালো লাগা অনুভূত হয় তেমনি খারাপ বললেও মন্দ লাগা গ্রাস করে। প্রোডাক্টের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

৩) সাস্টেইনেবিলিটি : এখন অধিকাংশ কোম্পানিই নিজের রিটেইল চ্যানেল খুলছে। নিজের বানানো প্রোডাক্ট সরাসরি কাস্টমারের ঘরে পৌছে দিচ্ছে। ট্রেডিং ব্যবসায়ীদের ব্যবসার স্কোপ দিনকে দিন কমছে এবং এটা সামনের দিনগুলোতে আরও খারাপ হবে। তাই ব্যবসায়িক পার্সপেক্টিভ থেকে চিন্তা করলেও প্রোডাকশন ব্যবসা বেশি ফিজিবল ও সাসটেইনেবল।

৪) হাই প্রফিট মার্জিন : নিজেরা সরাসরি খুচরা সেল করা গেলে প্রফিট মার্জিন অনেক ভালো থাকে প্রোডাকশন ব্যবসায়ীদের। উৎপাদকদের কয়েকটা স্লাপ রাখতে হয় প্রাইসিং-এর ক্ষেত্রে। ডিলার, পাইকার, খুচরা; আলাদা আলাদা প্রাইস। মাঝখানে ইন্টারমেডিয়ারি না থাকলে ভালো প্রফিট করা সম্ভব।

৫) হাই গ্রোথ রেট : ফাউন্ডার হিসেবে বা মালিক হিসেবে একটা প্রোডাকশন ব্যবসায় মনিটরিংটা কম দরকার পড়ে ট্রেডিং ব্যবসার তুলনায়। একটা রোল থেকে কয়টা ব্যাগ হবে বা এক কেজি কাপড়ে কয়টা টিশার্ট হবে এটার হিসেব মোটামুটি ফিক্সড। আপনার ফ্যাক্টরিতে কয়টা রোল ঢুকলো আর কয়টা ব্যাগ বেরুলো এটার হিসেব রাখলেই আপনার মনিটরিং মোটামুটি যথেষ্ট, কিন্তু ট্রেডিং- এ ওউনারের এনগেজমেন্টটা অনেক বেশি থাকে। একারণে ট্রেডিং ব্যবসায় ওউনার বিজনেস গ্রোথ বা বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশনে বেশি সময় দিতে পারেন না। গ্রোথটাও কম হয়। প্রোডাকশন ব্যবসায় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা ফরওয়ার্ড লিংকেজ বিজনেস শুরু করা ইজি। আমাদের কথাই ধরি, আমরা মূলত ব্যাগের ব্যবসা করতাম, সেজন্য স্ক্রিন প্রিন্ট সেট আপ, সুইং এর সেট আপ আমাদের আছে। সেই একই সেট আপ দিয়ে অল্প কয়টা মেশিন দিয়ে নতুন কোন সেট আপ কস্ট ছাড়াই আমরা টিশার্ট, হুডির প্রোডাকশনেও ঢুকতে পেরেছি, আমাদের ব্যবসা এক্সপান্ড করতে পেরেছি। প্রোডাকশন ব্যবসার এটাই মজা।

৬) বাই প্রোডাক্ট বিজনেস : প্রোডাকশন বিজনেসে বাই প্রোডাক্টের একটা খেলা আছে। উদাহরণ দেই, একটা প্লাই উডের আলমারিতে ধরুণ তিনটা প্লাই বোর্ড লাগবে। প্রোডিউসার সব সময় আলমারির কস্টিং এই তিনটা বোর্ডের হিসেব ধরেই করবে। কিন্তু এই আলমারিটা বানানোর পরে বেশ কিছু টুকরো কাঠ বেচে যাবে, যেটা দিয়ে সে হয়তো জুতার র‍্যাক বানাবে অথবা ওয়াল র‍্যাক বানাবে। এটা কিন্তু পুরা ফাও ইনকাম, বাই প্রোডাক্ট বিজনেস। প্রতিটা প্রোডাকশন ব্যবসায় এরকম কিছু বাই প্রোডাক্ট বিজনেস আছে, যেই সুবিধা ট্রেডিংএ পাওয়া সম্ভব না।

৭) এডপ্টেশন : প্রোডাক্টের নতুন কোন ফিচার বের হলে বা কোন নিড তৈরি হলে প্রডিউসার হিসেবে কিন্তু খুব দ্রুতই সেটাতে রেসপন্ড করা যায়। কিন্তু ট্রেডিং ব্যবসায় এক্ষেত্রে প্রডিউসারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। প্রোডাক্টে নিজের চাহিদা, অভিরুচির প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব হয় না একজন ট্রেডিং ব্যবসায়ীর।

৮) টেকনিকাল স্কিল : প্রোডাকশনে অনেক টেকনিকাল স্কিল শেখা যায়, যেটা ব্যবসা এক্সপানশনের ক্ষেত্রে কাজে লাগে। পরবর্তীতে নিজে কখনো এই ব্যবসায় না-ও থাকলে অন্য ব্যবসা বা চাকরির ক্ষেত্রে এই স্কিল কাজে লাগানো যায়।

আজ এপর্যন্তই। কোন ব্যবসাকেই ছোট করা আমার উদ্দেশ্য না। আমি আগেই বলেছি, সব ব্যবসাই ভালো, একেকজনের জন্য একেকটা ফিট। এখানে আমি শুধু আমার অভিরুচির কথা বলেছি। সবাই ভালো থাকবেন।

লেখক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫তম ব্যাচ।পড়েছেন আইবিএ-তে।

About ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স ম্যাগাজিন

View all posts by ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স ম্যাগাজিন →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *