সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়ে ক্যারিয়ার সম্ভাবনা কেমন?

0
483
সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়ে ক্যারিয়ার সম্ভাবনা

সমাজবিজ্ঞান হলো- মানবসমাজ বা দলের বৈজ্ঞানিক আলোচনা শাস্ত্র। এতে সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনের সামাজিক দিক এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়। সমাজ বিষয়ক গবেষণা অতীতকাল থেকেই প্রচলিত। তবে অগাস্ট কোঁৎ সর্বপ্রথম ১৮৩৮ সালে এর রীতিবদ্ধ আলোচনা করেন। এছাড়া হার্বাট স্পেনসার সমাজবিজ্ঞানের মূলনীতিগুলো স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের স্থপতি হিসেবে ফরাসি পণ্ডিত এমিল ডুর্খেইম এবং জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েভারের নাম উল্লেখযোগ্য।

হ্যাঁ বন্ধু ঠিকই ধরেছেন- আমাদের আজকের পড়ার বিষয় সমাজবিজ্ঞান। এই নিবন্ধে আমরা Sociology বিভাগে পড়ে একজন শিক্ষার্থী যেসব ক্যারিয়ার গড়তে পারে সে সম্পর্কে আলোকপাত করব।

সমাজবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়

সমাজবিজ্ঞানের সূচনালগ্ন থেকেই সমাজবিজ্ঞানীরা মানুষ এবং সমাজের গতিশীলতার দিকে নজর দিয়েছেন। তাঁরা সমাজবিজ্ঞানের অধ্যায়নকে সমৃদ্ধ করতে যুগে যুগে বিভিন্ন পদ্ধতি বিকাশ করেছন। যা সমাজবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে বিষয়টির ক্ষেত্রও হয়েছে বিস্তৃত। বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার বিস্তার ঘটেছে। এ সকল শাখা-প্রশাখার সৃষ্টি বা উদ্ভব হয়েছে কেবল সমাজ অধ্যয়ন ও গবেষণার প্রয়াসে।

  • অর্থনৈতিক সমাজবিজ্ঞান (Economic Sociology): এটি সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে এখানে অধ্যয়ন করা হয়। শিল্পসমাজে কর্ম, বেকারত্ব ও অবসর -এর উপর এটি আলোকপাত করে থাকে।
  • রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান (Political Sociology): ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণ ও ফলাফল, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক পটভ‚মি প্রভৃতি নিয়ে এটি অধ্যয়ন করে।
  • গণমাধ্যমের সমাজবিজ্ঞান (Media Sociology): গণমাধ্যমের সামাজিক ভিত্তি, প্রযুক্তির বিকাশ, বিষয়বস্তুর সামাজিক নির্মাণ, ফলাফলকে গণমাধ্যমের সমাজবিজ্ঞানে চর্চা করা হয়। মানুষ কিভাবে গণমাধ্যম ব্যবহার করে এটিও এর বিষয়বস্তু।
  • নগর সমাজবিজ্ঞান (Urban Sociology) নগর সমাজবিজ্ঞান নগরের সামাজিক সম্পর্ক এবং কাঠামোকে অধ্যয়ন করে। নগরের উদ্ভব, নগরের কাঠামো এবং নগর জীবনের সমস্যা নিয়ে নগর সমাজবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে।
  • স্বাস্থ্য ও রোগের সমাজবিজ্ঞান (Sociology of Health and Illness) সমাজবিজ্ঞানের এ শাখাটি স্বাস্থ্য ও রোগের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক, অসুস্থতা বা রুগ্নতার কারণ ও বিস্তার এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা ব্যবস্থা ও এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে।

এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি শাখা-প্রশাখা রয়েছে যা নিয়ে এটি আলোচনা করে। যেমন-

  • সাহিত্যের সমাজবিজ্ঞান (Sociology of Literature)
  • ঐতিহাসিক সমাজবিজ্ঞান (Historical Sociology)
  • গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান (Rural Sociology)
  • আইনের সমাজবিজ্ঞান (Sociology of Law)
  • শিক্ষার সমাজবিজ্ঞান (Sociology of Education)
  • বিপর্যয়ের সমাজবিজ্ঞান (Sociology of Disaster)
  • সংগঠনের সমাজবিজ্ঞান (Sociology of Organization)

সমাজবিজ্ঞান পড়ে ক্যারিয়ার সম্ভাবনা

সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা শেষে আছে বিভিন্ন কর্মের হাতছানি। সমাজবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারীদের রয়েছে সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সমাজসেবা অধিদপ্তরের পাশাপাশি দাতব্য ও বেসরকারি সংস্থায় পেশাগতভাবে কাজ করার সুযোগ।
এছাড়াও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক, দেশি ও স্থানীয় এনজিওগুলোর বিভিন্ন বিভাগে চাকরির সুযোগ পেয়ে থাকেন এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

সমাজবিজ্ঞানে পড়ে কোন পদে চাকরি পাবেন?

গবেষণা, উন্নয়ন, প্রোগ্রাম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন। এছাড়া সামাজিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অধীনে গবেষক, সহকারী গবেষক, মাঠ গবেষণা পর্যবেক্ষক, পর্যবেক্ষক, গবেষণা পদ্ধতি উন্নয়নকারী, তথ্য সংগ্রহকারী এবং গবেষণা প্রতিবেদক হিসেবেও কাজ করতে পারেন।

একজন সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে; যেমন- ইউএনডিপি, ইউনেসকো, ইউনিসেফে চাকরি করে আন্তর্জাতিক স্কেলে বেতন প্রাপ্ত হন।

দেশের বাইরে অ্যামেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াতে সমাজবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারীদের রয়েছে বিশেষ কদর।

বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের যাত্রা

স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিভাগে সহায়ক কোর্স হিসেবে বিষয়টি পড়ানো হতো। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল করিমের আগ্রহের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্ভাব্যতা যাচাই করে ইউনেসকোর কাছে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ চালু করার জন্য সহযোগিতা কামনা করে।

ইউনেসকো বিভাগটি চালুর বিষয়ে সহযোগিতা করতে সামাজিক নৃবিজ্ঞানী ড. পেরি বেসাইনিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়। এই ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনেসকোর যৌথ উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। ইউনেসকোর বিশেষজ্ঞ ড. পেরি বেসাইনি বিভাগের প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। অধ্যক্ষ নাজমুল করিমসহ মোট চারজন শিক্ষক নতুন এই বিভাগে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় এটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।

পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে সমাজবিজ্ঞানের অধ্যয়ন শুরু হয়। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কলেজেও বিভাগটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর বিকাশ অব্যাহত রয়েছে।

সমাজবিজ্ঞান : বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ

সমাজবিজ্ঞানে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান প্রভৃতি দেশসহ অনেক উন্নত দেশে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। প্রতিবছরই অনেক শিক্ষার্থী সামাজবিজ্ঞানে পড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ অন্যান্য উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন।

এ বিষয়ে পড়ালেখার জন্য উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য অনেক বৃত্তির সুযোগ দেয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ফুলব্রাইট বৃত্তি, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো ইরাসমাস মান্ডিস বৃত্তি, নরওয়েতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কোটা বৃত্তি, যুক্তরাজ্যে কমনওয়েলথ বৃত্তি, অস্ট্রেলিয়ায় ইউএনএসডাব্লিউ বৃত্তি উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া উন্নত দেশগুলোর অধ্যাপকেরা নিজেদের গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অনেক ছাত্রছাত্রীকে বৃত্তি দিয়ে থাকে।

 

ঘোষণা

আপনিও লিখুন


প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্সে। শিক্ষা, ক্যারিয়ার বা পেশা সম্পর্কে যে কোনো লেখা আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন। পাঠাতে পারেন অনুবাদ লেখাও। তবে সেক্ষেত্রে মূল উৎসটি অবশ্যই উল্লেখ করুন লেখার শেষে। লেখা পাঠাতে পারেন ইমেইলে অথবা ফেসবুক ইনবক্সে। ইমেইল : [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here