ফাইনম্যান কৌশল : সহজে শেখার সেরা উপায়

0
34
ফাইনম্যান কৌশল : সহজে শেখার সেরা উপায়

মো. বাকীবিল্লাহ : রিচার্ড ফাইনম্যান (১৯১৮-১৯৮৮)। একজন লেখক, অসাধারণ শিক্ষক, দার্শনিক, পদার্থবিদ। কোনো কিছু শেখার ক্ষেত্রে ফাইনম্যানের একটি অসাধারণ কৌশল আছে। যাকে আমরা বলতে পারি ‘শেখার ফাইনম্যান কৌশল’।

একদিন রিচার্ড ফাইনম্যান ও তার বাবা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তার বাবা তাকে একটি পাখি দেখিয়ে বললেন- “এটি একটি বাদামি গলার থ্রাশ। জার্মান ভাষায় একে বলে হ্যালজেনফুগেল, চীনারা বলে চুং লিং এবং অন্যান্য ভাষায় একে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তুমি যদি পৃথিবীর সকল ভাষায় পাখিটির নাম জানো তবুও তুমি কিছুই জানো না, পাখিটির সম্পর্কে একেবারে কিচ্ছুই জানো না।”

ফাইনম্যান শিখলেন যে – কোনোকিছুর নাম জানা আর সেটি সম্পর্কে কিছু জানার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। কেবল নাম জানাই জ্ঞান বৃদ্ধি করে না।

শুধুমাত্র কোনোকিছুর নাম জানার পরিবর্তে বস্তুটি সম্পর্কে জানাই হচ্ছে ফাইনম্যান ফর্মুলার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আজ আমরা এই নিবন্ধে শিখব।

কী আছে ফাইনম্যান ফর্মুলায়?

ফাইনম্যান ফর্মুলায় শেখার চারটি ধাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
১. শেখা বা জানার বিষয়টি বাছাই করুন। জানুন, বুঝুন।
২. এবার মনে করুন বিষয়টি ১০/১২ বছরের কাউকে শেখাচ্ছেন।
৩. বোঝানো বা লেখার সময় যেখানে আটকে যাচ্ছেন, সে গ্যাপগুলো চিহ্নিত করুন। যেসব জায়গা থেকে শিখছিলেন সেখানে আবার ফিরে যান। আবার ভালোভাবে পড়ুন। বোঝার চেষ্টা করুন।
৪. এবার পর্যালোচনা করুন। আরো সহজ করুন।

এখন আসুন, বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করি।

জ্ঞানকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। এক ধরনের জ্ঞান হচ্ছে- কোনো কিছুর নাম জানা। দ্বিতীয় হচ্ছে- প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছু সম্পর্কে জানা মানে বিষয়টাকে বোঝা বা অনুধাবন করা। আমাদের অনেকেই আসলই ভুল করি। বিষয়টাকে জানা বা বোঝার চেয়ে তার নাম জানার ব্যাপারে বেশি ফোকাস করি।

আরো পড়ুন :  পড়ায় বসে না মন

ফাইনম্যান আসলে কোনো কিছু সম্পর্কে জানা আর তার নাম জানার মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতে পেরেছিলেন। আর এটাই তার সফলতার অন্যতম বড় কারণ।

যদি কোনো ব্যক্তি বলেন- যা ভাবছেন তা তিনি জানেন অথচ তা প্রকাশ করতে পারেন না; তাহলে তিনি প্রকৃতপক্ষে কী ভাবছেন সেটা জানেন না। -মর্টিমার অ্যাডলার

ফাইনম্যান কৌশল কিভাবে কাজে লাগাবেন?

ধাপ ১ : বিষয়টি কোনো শিশুকে শেখান

একটি সাদা কাগজ বা নোটবুক নিন। যে বিষয়ে শিখতে চান তা উপরে লিখুন।

এবার বিষয়টি সম্পর্কে আপনি যা জেনেছেন তার সবকিছু লিখে ফেলুন। লেখার ভাষা হবে আপনি যেন কোনো শিশুকে তা শেখাচ্ছেন। আপনার কোনো বয়স্ক বন্ধুকে না বরং ১২ বছরের কোনো শিক্ষার্থী যেন তা বুঝতে পারে।

আমরা অনেক সময় কোনো কিছু ভালোভাবে না বোঝার কারণে লেখায় অনেক শক্ত ও দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহার করে ফেলি। কিন্তু আপনি যখন কোনো বিষয়কে শিশুদের বোঝার মতো করে উপস্থাপন করতে চাইবেন; এর মানে হচ্ছে- আপনি ওই বিষয়ে গভীর জ্ঞানার্জন ও তা সহজভাবে উপস্থাপনের জন্য নিজেকে চাপ দিচ্ছেন।

এক্ষেত্রে কিছু বিষয় আপনার জন্য উপস্থাপন করা সহজ হবে। যেগুলো আপনি ভালোভাবে শিখতে পেরেছেন বা উপলব্ধি করেছেন। আবার কিছু বিষয় নিয়ে আপনাকে কষ্ট করতে হবে। মূলত এই পয়েন্টগুলোতে আপনার বোঝার দুর্বলতা রয়েছে।

ধাপ ২ :  পর্যালোচনা

আপনি যখন আপনার জ্ঞানের দুর্বলতাগুলোর মুখোমুখি হন- যেখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভুলে যান বা এটি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম না হন; তখন আপনি সত্যিই শেখা শুরু করতে পারেন। শেখার তাগিদ অনুভব করেন।

এখন আপনি কোথায় আটকে গেছেন তা জানার পরে, যেখান থেকে শিখেছেন সেই বই-পুস্তক বা উৎসের কাছে ফিরে যান। মূল বিষয়গুলি ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারা পর্যন্ত তা পুনরায় শিখুন। যখন আপনি পরিভাষা ছাড়াই সহজ ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারবেন, কেবল তখনই আপনি আপনার বুঝেছেন বলে গণ্য করতে পারেন।

আরো পড়ুন :  বুক রিভিউ কী ও কেন? কিভাবে লিখবেন?

নিজের জানা-বোঝার সীমা চিহ্নিত করতে পারলে- আপনি যখন জ্ঞানকে ব্যবহার করবেন তখন ভুল কমে যাবে। একই সাথে বাড়বে সফলতার সুযোগ।

ধাপ ৩ : গোছান ও সহজ করুন

এবার হাতে তৈরি নোট আছে আপনার সামনে। সেটি পর্যালোচনা করুন। দেখুন ভুলক্রমে কোনো পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করে ফেলেছেন কি-না। সেগুলো আপনার ভাষায় লিখুন এবং জোরে জোরে পড়ুন। যদি বর্ণনাটি সহজ না হয় বা বিভ্রান্তিমূলক মনে হয়- তবে এটা ইংগিত দিচ্ছে যে, এ বিষয়ে আপনাকে আরেকটু কাজ করতে হবে।

আপনি যদি এই পদ্ধতি বারবার অনুসরণ করেন তবে বছর শেষে দেখতে পাবেন আপনার জানাশোনার পরিধি কোন স্তরে উপনীত হয়।

ধাপ ৪ (অতিরিক্ত) : কারো সাথে শেয়ার করুন

আপনি যদি সত্যিই বোধগম্যতার বিষয়টি নিশ্চিত হতে চান, তাহলে বিষয়টি কাউকে বোঝান। এক্ষেত্রে ১২ বছর বয়সী কাউকে খুঁজে বের করুন। আপনার জ্ঞানের চূড়ান্ত পরীক্ষা হচ্ছে অন্যকে বোঝানোর ক্ষমতা অর্জন।

ফাইনম্যান কৌশল শুধু শেখার ক্ষেত্রেই না, বরং যেকোনো বিষয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করার জানালা খুলে দেবে। একই সাথে চিন্তাগুলোকে ভেতর থেকে পুনর্গঠন করতে পারবেন।

কথোপকথনের সময় কেউ যদি আপনার দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করে তবে তাকে বলুন- আমাকে ১২ বছর বয়সী লোকের উপযোগী করে ব্যাখা করুন। এটা শুধু আপনার জ্ঞানকেই বাড়াবে না, বরং তারাও উপলব্ধি করতে পারবেন যে তারা কী বলছেন।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক ও প্রকাশক; ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here