বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশন বা ব্যবসায়ে বৈচিত্র্য কেন প্রয়োজন?

/ ৬৪ বার পঠিত

সাগর হাসনাত : অনেকের অভিযোগ আমি বিজনেসে ফোকাসড না। আজ মাস্ক, তো কাল মশলা, পরশু ব্যাগ, তো তরশু টিশার্ট। ছোটবেলা থেকেই আমি একটু অস্থির প্রকৃতির, এটা সত্য। পরীক্ষার খাতা রিভিশন না দেয়ার জন্য আম্মুর বকা খাওয়া ছিল কমন। পরীক্ষা দেয়ার পর সেই খাতা রিভিশন দেয়ার মতো ধৈর্য্য আমার কখনই ছিল না। বড়বেলাতে এসেও এই যে ব্যবসায় বৈচিত্র্য, এতেও যে সেই চাঞ্চল্য নেই তা বলছি না। হয়তো আরেকটু ধীরে চলা বা আরেকটু ফোকাস হওয়া উচিত ছিল।

তবে এই ডাইভার্সিফিকেশনের পেছনে কিন্তু অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এগুলো ব্যাকড বাই থিওরি। তাই এই লেখাটি নিজের স্বীকারোক্তিমূলক হলেও আশা করি নতুনদের জন্য কাজে দিবে। তো চলুন জেনে নিই- কেন বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশন বা ব্যবসায়ে বৈচিত্র্য জরুরি? বিজনেস ইউনিট বাড়লে এটা আপনাকে ব্যবসায় কী কী সুবিধা দেবে?

যে ৭ কারণে  বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশন প্রয়োজন

১. ডেলিভারি চেইনে সুবিধা

বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশন করার পেছনে আমার অন্যতম কারণ হলো- ডেলিভারি চেইনে বেনিফিট নিয়ে আসা। আমার যাত্রা শুরু এবং অদ্যাবধি পথচলা অনলাইনে। যারা এই লাইনে কাজ করছেন তারাই জানেন এ ব্যবসার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো- ডেলিভারি চ্যানেলটা মেইনটেইন করা।

থার্ড পার্টি কুরিয়ার হ্যান্ডেল করার মতো প্যারা আর দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু ৮-১০ টা ডেলিভারি ডেইলি না থাকলে নিজের একটা ডেলিভারি চ্যানেল ডেভেলপ করারও হাতি পোষার সামিল। আবার ফেসবুকের একটা ছোট বিজনেস থেকে প্রতিদিন ৮-১০ অর্ডার পাওয়া অনেক কঠিন। তাই এরকম ছোট ছোট ২-৩টা ভেঞ্চার আপনাকে এনে দিতে পারে সেই কাঙ্ক্ষিত ৮-১০টি অর্ডার। ফলে আপনি নিজের মতো করে ডেলিভারি চ্যানেলটা সাজাতে পারবেন।

ডেলিভারিম্যানকে COD (ক্যাশ অন ডেলিভারি) দিয়ে প্রোডাক্ট পাঠিয়ে দেয়ার পর কাস্টমার যদি ফোন দিয়ে বলেন, বিকাশে পেমেন্ট দেবেন, ব্যস একটা ফোনকল যথেষ্ট। টি-শার্ট, পিপিই ৩-৪টা পাঠিয়ে দিতে পারবেন কাস্টমারের নিজে পছন্দ করে নেয়ার জন্য। যেকোনো ইস্যু খুব দ্রুত ও সহজে ম্যানেজ করা যায় নিজের ডেলিভারিম্যান থাকলে, যেটা থার্ড পার্টিতে হ্যান্ডেল করা খুব কঠিন, মাঝে মাঝে অসম্ভব।

সীমিত রিসোর্সকে আপনি অপটিমাম ব্যবহার করতে পারবেন SBU থাকলে। এজন্য ডাইভার্সিফিকেশন জরুরি।

সীমিত রিসোর্সকে আপনি অপটিমাম ব্যবহার করতে পারবেন SBU থাকলে। এজন্য ডাইভার্সিফিকেশন জরুরি।

২. নেক্সট লেভেলে যাওয়া

প্রত্যেকটা ব্যবসায়ের অনেকগুলো পর্যায় থাকে। প্রথমে ছোট আকারে শুরু করলেও সবার স্বপ্ন থাকে সেটাকে আরও বড় করা, কমার্শিয়ালাইজেশন করা বা পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়া। যেটাকে কেতাবি ভাষায় ‘স্কেল আপ’ বলে।

যেকোনো ব্যবসায় শুরু করে সেটাকে একটা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সহজ। স্কেল আপ করতে গেলে অনেক ফান্ডের দরকার, অনেক সময়ের দরকার। আমি যেহেতু ব্যাংক লোন নেব না বা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারি না, তাই আমার জন্য একটি উদ্যোগ নিয়ে পড়ে থাকা যুক্তিহীন। তাই ভেঞ্চারকে একটা লেভেলে নিয়ে যাবার পর আরেকটা ছোট উদ্যোগ শুরু করি।

আমার লক্ষ্য হলো- এরকম ২-৩টা উদ্যোগকে সাথে নিয়ে সমান্তরালভাবে নেক্সট লেভেলে যাওয়া বা স্কেল আপ করা।

৩. রিসোর্সের সর্বোচ্চ ব্যবহারে বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশন

আপনার ২-৩টা ভেঞ্চার (এগুলোকে বিজনেসের ভাষায় SBU বলে, Strategic Business Unit, এরপর থেকে আমরা SBU টার্মটা ইউস করব) থাকলে একই রিসোর্স আপনি সবগুলোতে কাজে লাগাতে পারবেন।

আমার ব্যাগের প্রিন্টিং সেট আপ দিয়েই টিশার্ট তৈরি করতে পারছি। টিশার্ট শোরুমের ম্যানেজারকে দিয়ে খাবার প্যাকেজিং করাতে পারছি। কারখানার ওয়ার্কার দিয়ে হোম ডেলিভারি দেয়াতে পারছি। সীমিত রিসোর্সকে আপনি অপটিমাম ব্যবহার করতে পারবেন SBU থাকলে। এজন্য ডাইভার্সিফিকেশন জরুরি।

৪. ক্যাশ কাউ জেনারেট করা

ক্যাশ কাউ বলে ওই বিজনেসকে- যেটা আপনাকে অল্প পরিশ্রম ও ইনভেস্টমেন্টে ক্যাশ দিতেই থাকবে। যেকোনো ব্যবসায়ীর জন্য ক্যাশ কাউ ডেভেলপ করা স্বপ্নের মতো। কারো প্রথম উদ্যোগই ক্যাশ কাউ হয়ে যায়, কারো বা লাগে ৮-১০টি ভেঞ্চার।

এরকম একটা ক্যাশ কাউ থাকলে বিজনেস সাসটেইন করা বা বাকিগুলোকে টেনে নেয়া ইজি। আমি যেহেতু এখনও ক্যাশ কাউয়ের সন্ধান পাইনি, তাই বাড়িয়েই চলছি ব্যবসা, দেখি কবে দেখা পাই সেই দুধেল গরুর।


ব্যবসায় করতে চান? এ পরামর্শ আপনার অনেক টাকা বাঁচিয়ে দেবে


৫. নতুন শুরুর উত্তেজনা

মানুষ এই যে এতো কষ্ট করে অ্যাডভেঞ্চারে যায়, মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে ওঠে, কিসের জন্য? নতুন কিছু করা, নতুন কিছু দেখার উত্তেজনা থেকেই তো। নতুন একটি বিজনেসও এরকম নতুন একটি উত্তেজনা, অদেখাকে দেখা, অজানাকে জানা, এ্যাড্রেনালিন রাশ।

একই বিজনেসে বছরের পর বছর পরে থাকা একঘেয়েমি এনে দিতে পারে। বিজনেসের প্রতিই বিরক্তি এনে দিতে পারে, ফ্যাটিগ তৈরি করতে পারে। নতুন একটি বিজনেস, ফ্রেশ একটি স্টার্ট, আপনাকে উজ্জীবিত করতে পারে। নতুন কিছু জানা, নতুন কিছু শেখার উত্তেজনা এনে দিতে পারে, যা কোনো অংশেই পাহাড়ে উঠা বা অ্যাডভেঞ্চার করার চেয়ে কম নয়।

৬. অফসিজনে বসে না থাকা

প্রায় প্রতিটা বিজনেসে সিজন, অফসিজন আছে, পিক টাইম, অফ টাইম আছে। অফসিজনে এমপ্লয়ি পোষা হাতি পোষার সামিল। আবার তাদেরকে যে ছেড়ে দিবেন বা টিম ছোট করবেন তাতেও সমস্যা, পিক টাইমে বিপদে পড়বেন।

SBU থাকলে আপনি একটা বিজনেসের অফসিজনে আপনার টিমকে অন্য বিজনেসে কাজে লাগাতে পারবেন। করোনার এই সময়ে ব্যবসার ধীরগতির কারণে আমাদের ব্যাগের ব্যবসায় মন্দা চলছে, তবে আমরা কিন্তু বসে নেই। পুরো টিমকে মাস্ক, খাবার, টিশার্টের কাজে লাগিয়ে দিয়েছি, হোম ডেলিভারিতে ব্যস্ত আছি। শুধু ব্যাগ নিয়ে পড়ে থাকলে ব্যবসায় বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকত না।

৭. ক্রোস সেলিংয়ের জন্য বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশন

একটা বিজনেসে আপনার ভালো কাস্টমার বেস তৈরি হলে বা একটা গুড রেপুটেশন তৈরি হলে এই কাস্টমার বেসকে আপনি আপনার অন্য বিজনেসেও কাজে লাগাতে পারবেন। যে আপনার খাবারের প্রোডাক্টে সন্তুষ্ট, আপনি যখন মাস্ক নিয়ে আসবেন, তখন তিনি এধারণাটা পাবেন যে হাজারও ভেজালের ভিড়ে আপনি তাকে ভালো জিনিসটাই দেবেন।

আমার কাছে কেউ যখন মাস্কের খোঁজ করে, তখন তাকে খাবারের লিস্টটাও ধরিয়ে দেই বা ভাইস ভার্সা, আর কিছু লাগবে কি-না জিজ্ঞেস করি। SBU এর মাধ্যমে আপনি এ রকম ক্রোস সেল করতে পারবেন।

এগুলোর বাইরেও বই ও আর্টিকেলে বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশনের আরও অনেক উপকারিতার কথা পাবেন। রিস্ক মিনিমাইজেশন, কস্ট কাটিংসহ আরও অনেক কিছু। ফাইন্যান্সে তো খুব পপুলার একটা প্রবাদ আছে ডাইভার্সিফিকেশন নিয়ে- “Don’t put your all eggs in one busket”.

তবে বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশনের অনেক নেগেটিভ সাইডও আছে। বিজনেসে ফোকাস নষ্ট হয়ে যায়, গ্রোথ কমে যায়, মাল্টিটাস্কিং না হলে ম্যানেজ করা খুব ডিফিকাল্ট। তাই উপরে উল্লেখিত পয়েন্টগুলোর আলোকে আপনার নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কখন ডাইভার্সিফিকেশন করবেন। কতটুকু করবেন, কিভাবে করবেন বা আদৌ করবেন কি-না, নাকি একটাতেই ফোকাস থেকে সেটাকে পিকে নিয়ে যাবেন।

লেখক : তরুণ উদ্যোক্তা

One Response

  1. আহমাদ মাহদী ২৭ জুন ২০২০; ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ

Leave a Reply

ইমেইলে ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স পড়ছেন
১৩৬৭ জন পাঠক । আপনিও পড়ুন।
আপনার ইমেইল ঠিকানা লিখুন:


এবার নিজের ইমেইলে গিয়ে ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স
থেকে পাঠানো লিঙ্কে ক্লিক করুন।
সহযোগিতায় : ফিডবার্নার