অভিভাবক-স্কুল সম্পর্ক কেন দরকার? কিভাবে তৈরি করবেন?

অভিভাবক-স্কুল সম্পর্ক

মো. বাকীবিল্লাহ : স্কুল ও শিক্ষার্থীর পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কার্যকর যোগাযোগ খুবই জরুরি। অভিভাবক-স্কুল সম্পর্ক শিক্ষায় পরিবারের সম্পৃক্ততার ভিত্তি তৈরি করে। শিক্ষার্থীর অ্যাকাডেমিক উন্নতি ত্বরান্বিত করে।

অভিভাবকের লাভ

অভিভাবক ও স্কুলের মধ্যে ইতিবাচক যোগাযোগ সন্তানের পিতামাতার জন্যই উপকারী। এর মাধ্যমে বাচ্চাদের শেখার সাথে বাড়ির তথা পরিবারের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও গুণমানকে প্রভাবিত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- স্কুল থেকে সন্তানের পড়াশোনায় উন্নতির ব্যাপারে খারাপ কোনো খবর পেলে অভিভাবক বুঝতে পারেন যে, তার বাচ্চার পড়াশোনার ক্ষেত্রে নিজের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে। তাছাড়া সন্তানের জন্য এখন কী করা উচিৎ এ ব্যাপারে অভিভাবক স্কুল থেকে ধারণা পেতে পারেন। স্কুলের  বর্তমান শিক্ষাকার্যক্রম সম্পর্কেও হালনাগাদ থাকতে পারেন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- সন্তানের স্কুলের সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে আরো আত্মব্শ্বিাসী হয়ে ওঠেন। বাচ্চাদের শিক্ষায় তারা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন- বিষয়টি তারা আরো বেশি উপলব্ধি করতে পারেন।
অভিভাবকদের সাথে যখন যোগাযোগ করবেন তখন তিনটি বিষয়ে অবশ্যই আপনার মন্তব্য জানান।

ক. শ্রেণীকক্ষে তার অংশগ্রহণ ও পারফরমেন্স
খ. সন্তানের সাফল্য
গ. সন্তানের শিক্ষার ব্যাপারে বাসায় কিভাবে অভিভাবক সাহায্য করতে পারেন?

শিক্ষার্থীর উপকার

গবেষণায় দেখা গেছে- স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমে পিতা-মাতার অংশগ্রহণের ফলে সন্তানের অ্যাকাডেমিক অর্জনসহ বিভিন্ন উপকারিতা রয়েছে। যেমন- শেখার প্রতি আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা বৃদ্ধি, ভালো আচরণ, আরো নিয়মিত উপস্থিতি এবং  সাধারণভাবে হোমওয়ার্ক ও স্কুল সম্পকে আরো ইতিবাচক মনোভাব।

শিক্ষকদের লাভ

গবেষণা বলছে- অভিভাবকদের অংশগ্রহণের ফলে শিক্ষকেরা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আরো বেশি মনোযোগী হতে পারেন। অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগের ফলে শিক্ষক সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও বাসার পরিবেশ সম্পর্কে জানতে পারেন। তাই শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। স্কুলের সাথে যোগাযোগকারী অভিভাবকেরা শিক্ষকদের সম্পর্কে বেশি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ফলে শিক্ষকদের মনোবল বৃদ্ধি পায়।

আরো পড়ুন :  বাংলাদেশ ব্যাংকে সহকারী পরিচালক নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি

ভালো দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ

পরিবার ও স্কুলের মধ্যে ভালো দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ শিক্ষার্থীদের সফলতার জন্য খুবই জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে- একজন শিক্ষার্থী সম্পর্কে অভিভাবক ও শিক্ষক যত বেশি তথ্যের আদান-প্রদান করেন, ওই শিক্ষার্থী তত ভালো অ্যাকাডেমিক অর্জন করতে পারেন।

শিক্ষক ও অভিভাবকদের যোগাযোগের জন্য নিম্নোক্ত উপায়গুলো ব্যবহার করা যেতে পারে-

  • অভিভাবক সমাবেশ
  • শিক্ষক-অভিভাবক সঙ্ঘ বা স্কুল কমিউনিটি কাউন্সিল
  • সাপ্তাহিক/ মাসিক ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর কাজগুলো অভিভাবকদের দেখা ও মন্তব্যের জন্য পাঠানো
  • ফোন করা
  • ইমেইল অথবা স্কুলের ওয়েবসাইট

পাঠদান দক্ষতা বাড়ানোর কৌশল


যোগাযোগ কৌশল

ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সমাবেশ, হোম ভিজিট, ফোন করা ইত্যাদি যোগাযোগের কার্যকর উপায়। বর্তমানে সামাজিক পরিবর্তনের ফলে অভিভাবকদের সাথে স্কুলের যোগাযোগ বেশ জটিল হয়ে পড়ছে। কোনো একটি পদ্ধতি অবলম্বন করে কার্যকরভাবে অভিভাবক-স্কুল যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব না।  বর্তমান যুগে পিতা-মাতা দুজনের অফিস বা ব্যস্ততার ফলে অফিস সময়ে তাদের সাথে যোগাযোগ কঠিন। আমাদের অভিজ্ঞতা  থেকে দেখেছি- অনেক অভিভাবকই স্কুলে আসার সময় করতে পারেন না। সমাবেশগুলোতেও তাদের উপস্থিতি নেই। এ ধরনের অভিভাবকদের সন্তানেরাই অ্যাকাডেমিকভাবে বেশি দুর্বল। এসব পরিবারের সাথে যোগাযোগের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা প্রয়োজন। তাদের সময় অনুযায়ী বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। যা-ই হোক, যোগাযোগের কিছু কৌশল নিচে উল্লেখ করা হলো-

  • প্যারেন্ট নিউজলেটার
  • ওপেন হাউজ ডে (সবার জন্য উম্মুক্ত থাকবে স্কুল। যেকোনো অভিভাবক তার সময় অনুযায়ী এসে সন্তানের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সাথে কথা বলতে পারবেন।)
  • কারিকুলাম নাইট (অভিভাবকদের নিয়ে ডিনারের আয়োজন থাকবে। বার্ষিক এই অনুষ্ঠানে পুরো বছরের অ্যাকাডেমিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। এ সংক্রান্ত অভিভাবকদের প্রশ্নের উত্তর দেয়া হবে। )
  • হোম ভিজিট বা বাসা পরিদর্শন (যেখানে সম্ভব)
  • ফোন করা
  • বার্ষিক স্কুল ক্যালেন্ডার
  • বার্ষিক দাদা-দাদী দিবস
  • হোমওয়ার্ক হটলাইন
  • ক্লিনিক, মসজিদ/মন্দির/গির্জা বা জনসমাবেশে লিখিত বক্তব্য বিলি
  • স্কুলের ওয়েবসাইট
  • অভিভাবক ওয়ার্কশপ
  • বাবা বা মায়েদেরকে টার্গেট করে যোগাযোগ
আরো পড়ুন :  অনলাইনে চাকরির খোঁজ

কিছু বিষয় খেয়াল রাখুন-
১. শুরু : বছরের শুরুতেই যোগাযোগ শুরু করা।এটা  হতে পারে একটি পরিচিতিমূলক ফোন কল বা কোনো চিঠির মাধ্যমে।
২. সময়মতো : কোনো সমস্যা নজরে এলে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করা দরকার। কেননা দেরি করলে-আরো নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যা অভিভাবক বা শিক্ষার্থীর মাঝে হতাশার তৈরি করতে পারে।
৩. ধারাবাহিকতা ও বেশি বেশি : যোগাযোগের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। এবার যোগাযোগ করে পুরো সেমিস্টারে আর কথা না বললে- ওই যোগাযোগের ইফেক্ট নেই। অভিভাবকেরা চান, সন্তানের ব্যাপারে নিয়মিত আপডেট পেতে। হোমওয়ার্ক বা ক্লাস পারফরমেন্স কেমন তা জানতে।
৪. কথা রক্ষা : অভিভাবক ও শিক্ষকের মাঝে কথাবার্তার পর যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা বাস্তবায়ন জরুরি।  শুধু যোগাযোগেই সীমবাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
৫. যোগাযোগের স্পষ্টতা এবং উপযোগিতা : পিতামাতা এবং শিক্ষকদের মাঝে একটি বিষয়ে কমিটমেন্ট থাকা জরুরি যে, তারা চাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের সাহায্য করতে। সুতরাং শিক্ষার্থীর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সঠিক তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে এবং ভাষার ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।

অভিভাবককে সারপ্রাইজ দিন

অভিভাবকেরা সাধারণত সন্তানের ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তব্য স্কুল থেকে পান না। বরং বিভিন্ন সমস্যা হলেই তা জানানো হয়। মনে করুন আপনি অভিভাবক। আপনাকে সন্তানের স্কুল থেকে ফোন করে প্রিন্সিপাল বা কোনো শিক্ষক জানালেন- আপনার সন্তান স্কুলে অনেক ভালো করছে। অথবা তার ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন হয়েছে। সে ভালো কিছু করছে। তখন আপনার কেমন লাগবে? তাই যখন যোগাযোগের জন্য ফোন করবেন, তখন ইতিবাচক কিছু বলুন। তারা খুশি হবেন। আনন্দিত হবেন।

এই মুহূর্তে যদি কারো কোনো ভালো খবর থাকে, তাহলে আর দেরি কেন? এখনই ফোনটা করে ফেলুন না! অভিভাবকদের সাথে ভালো সম্পর্কের শুরুটা এখনই করুন।

ফোন-নির্দেশনা

অনেক সময় নতুন শিক্ষক হিসেবে প্রথম ফোন করাটা একটু কঠিন মনে হতে পারে। তাই ফোন করার আগে প্রস্তুতি নিন।

  • আপনার পরিচয় দিন
  • তারা সন্তান কী বা কেমন পড়াশোনা করছে তা জানান
  • স্কুলের কোনো প্রোগ্রামে বা অফিসে চা খাওয়ার দাওয়াত দিন
  • তাদের সন্তানের উন্নতির বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানান
  • সন্তানের অর্জনগুলো সম্পর্কে অবহিত করুন
  • তাদের সন্তানের ইতিবাচক দিকগুলো জানান। সম্ভব হলে কোনো ঘটনা উল্লেখ করুন।
আরো পড়ুন :  জিপিএ-৫ না পাওয়া হতে পারে জীবনের টার্নিং পয়েন্ট

লেখক : শিক্ষা উদ্যোক্তা ও ক্যারিয়ার কাউন্সিলর। সম্পাদক ও প্রকাশক, ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স

তথ্যসূত্র : রিডিং রকেটস

About সম্পাদক

মো: বাকীবিল্লাহ। গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলার পাথরঘাটাতে। থাকেন ঢাকার সাভারে। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে -- সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে অনার্স, মাস্টার্স । পরে এলএলবি করেছেন একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর লেখালেখি মূলত: ক্যারিয়ার বিষয়ে। তারই সূত্র ধরে সম্পাদনা ও প্রকাশ করছেন ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স নামে এই ম্যাগাজিনটি। এছাড়া জিটিএফসি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে কর্মরত। ভিডিও তৈরি ও সম্পাদনা, ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন এবং পাবলিক লেকচারের প্রতি আগ্রহ তাঁর।

View all posts by সম্পাদক →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *