ফিজিওথেরাপি কী ও কেন? কোথায় পড়বেন?

0
1,261 বার পঠিত

মো: বাকীবিল্লাহ : ফিজিওথেরাপি শব্দটি ফিজিও (শারীরিক) এবং থেরাপি (চিকিৎসা) শব্দ দুটি থেকে আগত। এই পদ্ধতির চিকিৎসকদের ফিজিওথেরাপিস্ট বলা হয়। ফিজিওথেরাপিস্টরা মানবদেহের চলন ও কার্যপ্রণালী উন্নয়ন, সর্বোচ্চ নড়ন ও চলনব্যাপ্তি, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার প্রতিকার ও নিরাময় করে থাকেন। এ ধরণের চিকিৎসা পদ্ধতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- এই পদ্ধতিতে ওষুধ প্রয়োগের পরিবর্তে শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগ নিরাময় ও প্রতিকার করা হয়। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বতন্ত্র চিকিৎসা পদ্ধতি। একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক রোগীর বাত-ব্যথা বা আঘাতজনিত ব্যথার মতো স্বাস্থ্যসমস্যা নির্ণয় করে পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা দেন। 

বাংলাদেশে বাত-ব্যথা ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা হয় না। এ কারণে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে প্রয়োজন যথাযথ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। দীর্ঘমেয়াদি রোগ, বিশেষ করে বাত-ব্যথা ও পক্ষাঘাতের রোগীদের সমস্যা ওষুধ দিয়ে নিরাময় সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা। এবার জেনে নেওয়া যাক কাদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন।

স্ট্রোক, আঘাত অথবা শল্যচিকিৎসায় স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতায় ভুগে পঙ্গুত্ব বরণ করে অনেকে। এ ধরনের রোগীর শরীর অবশ হয়ে যায় বা মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়। এসব রোগীর শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়ানো এবং অস্থিসন্ধি সচল রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। এদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় সক্ষম করে তুলতে ফিজিওথেরাপির বিকল্প নেই।

মোটকথা বিভিন্ন শারীরিক অক্ষমতার জন্য ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে যেমন- স্পাইনাল কর্ড অথবা জয়েন্টের রোগ, বুক ও পিঠের ব্যথা, অপারেশনের পর কোন ডিসঅর্ডার, সেরিব্রাল পালসি, ক্যান্সার, আঘাতজনিত ব্যথা, নার্ভের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক ইত্যাদি। এ ধরনের রোগের চিকিৎসার জন্য রয়েছে বিভিন্ন ফিজিওথেরাপি পদ্ধতি। যেমন- ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি, মোবিলাইজেশন, মুভমেন্ট উইথ মোবিলাইজেশন, থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ, ইনফিলট্রেশন বা জয়েন্ট ইনজেকশন, পশ্চারাল এডুকেশন, আরগোনমিক্যাল কনসালটেন্সি, হাইড্রোথেরাপি, ইলেকট্রোথেরাপি বা অত্যাধুনিক মেশিনের সাহায্যে চিকিৎসা ইত্যাদি।

ফিজিওথেরাপিস্টের প্রকারভেদ

বাংলাদেশে বিভিন্ন মানের ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছেন –

কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট : কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট হতে চাইলে কমপক্ষে ৪ বছরের কোর্স এবং ১ বছরের ইন্টার্নশিপসহ ফিজিওথেরাপি বিষয়ে ব্যাচেলর বা স্নাতক ডিগ্রি নিতে হবে। শুধুমাত্র ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীকেই ‘ফিজিওথেরাপিস্ট’ বলা হয়ে থাকে।

ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিস্ট : যিনি ফিজিওথেরাপি বিষয়ে ৩ বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন তাকে ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিস্ট বলা হয়। তিনি একজন কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে পারবেন।

অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্ট : মাত্র ১ বছরের কোর্স সম্পন্ন করেই অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্ট হওয়া যায়। তবে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্টকে অবশ্যই একজন কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধায়নে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে।

 লেখটির ভিডিও ভার্সন দেখুন এখানে

ফিজিওথেরাপি কোথায় পড়বেন?

বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে আরআইএইচডি-তে (বর্তমানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপডিক রিহ্যাবিলিটেশন- নিটোর) ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করা শুরু হয়। এছাড়াও বর্তমানে সিআরপি, গণবিশ্ববিদ্যালয়, পিপলস ইউনিভার্সিটি, স্টেট কলেজ অব হেলথ সাইন্সেসসহ মোট ৭টি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে কোর্স চালু আছে।

নিটোর : সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপডিক রিহ্যাবিলিটেশন- নিটোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ৪ বছর মেয়াদী ‘বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি’ কোর্স চালু আছে। স্নাতক পর্যায়ের এই কোর্সে ভর্তি হতে চাইলে প্রার্থীকে অবশ্যই জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয়সহ উচ্চমাধ্যমিক বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এসএসসি ও এইচএসসিতে মোট ন্যুনতম ৭ পয়েন্ট থাকতে হবে। তবে এসএসসি ও এইচএসসির প্রত্যেকটিতে আলাদাভাবে ৩ পয়েন্ট থাকতে হবে।

স্নাতকোত্তর পর্যায়েও পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে এখানে। ওয়েবসাইট : www.nitorbd.com

সিআরপি : দ্য সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইসড তথা সিআরপির অধীনে বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউটে (বিএইচপিআই) স্নাতক এবং ডিপ্লোমা দুই পর্যায়েই ফিজিওথেরাপি বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। স্নাতক প্রোগ্রামগুলো সাভারে এবং ডিপ্লোমা প্রোগ্রামগুলো মিরপুর ক্যাম্পাসে পরিচালিত হয়। স্নাতক প্রোগ্রামগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং ডিপ্লোমা কোর্সগুলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের অধীন পরিচালিত হয়। স্নাতক এবং ডিপ্লোমা দুই বিষয়েই ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান।

ভর্তির প্রক্রিয়া
প্রতিবছর মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির পরপরই বিএইচপিআইতে ভর্তি-প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিএসসি কোর্সের জন্য নভেম্বর-ডিসেম্বর আর ডিপ্লোমা কোর্সের জন্য জুলাই আগস্টে ভর্তি-প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত কেন্দ্র থেকে ফরম পূরণ করে জমা দেওয়ার পর লিখিত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। লিখিত পরীক্ষায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ডাকা হয় মৌখিক পরীক্ষায়। তবে এই প্রক্রিয়া শুধু বিএসসিতে পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য। ডিপ্লোমা কোর্সে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।

পড়ার খরচ, শেখার খরচ
সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক কম খরচ পড়বে বিএইচপিআইতে পড়তে গেলে। এখানে চার বছর মেয়াদি বিএসসি কোর্সে সর্বমোট খরচ পড়বে দুই লাখ ৪৮ হাজার টাকা। পঞ্চম বছর থাকবে ইন্টার্নশিপের জন্য, যেখানে শিক্ষার্থীকে মাসভিত্তিক বেতন দেওয়া হবে। ডিপ্লোমা কোর্সে তিন বছরে মোট খরচ পড়বে প্রায় এক লাখ তিন হাজার টাকা, যা শিক্ষার্থীরা মাসিক এক হাজার ৫০০ টাকা করে দিতে পারবেন।

ওয়েবসাইট : www.crp-bangladesh.org/educational-institute

গণবিশ্ববিদ্যালয় : ঢাকার সাভারে অবস্থিত গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে ইন্টার্নশিপসহ ৫ বছর মেয়াদী স্নাতক এবং ২ বছর মেয়াদী স্নাতকোত্তর কোর্স চালু আছে। স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নের ন্যূনতম যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ন্যূনতম যোগ্যতা এমবিবিএস অথবা বিএসসি ইন নার্সিং অথবা ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি।

ওয়েবসাইট : www.gonouniversity.edu.bd/physiotherapy/

স্টেট কলেজ অব হেলথ সাইন্সেস : ঢাকায় অবস্থিত স্টেট কলেজ অব হেলথ সাইন্সেস-এ স্নাতক পর্যায়ে বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।

সূত্র : প্রথম আলো ও ক্যারিয়ার কী

(প্রিয় পাঠক, আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে জানাতে পারেন মন্তব্যে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here