প্রাত্যহিক জীবনে কমন সেন্স : জেনে নিন বাড়ানোর উপায়

মো. বাকীবিল্লাহ : আমরা কথায় কথায় বলি- লোকটার কমনসেন্স নেই। না হয় এ ধরনের কাজ তিনি কিভাবে করলেন? কমনসেন্সের অভাবে আমাদের জীবনে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। অথচ কমনসেন্স থাকলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়।

কমন সেন্স আসলে কী?

কমন সেন্স শব্দটি ইংরেজি। এর বাংলা অর্থ আক্কেল বা কাণ্ডজ্ঞান। উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে- Common sense is sound practical judgment concerning everyday matters, or a basic ability to perceiveunderstand, and judge that is shared by (“common to”) nearly all people.
অর্থ্যাৎ, কমনসেন্স হচ্ছে- দৈনন্দিন বিষয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ বাস্তব বিচারবুদ্ধি। অথবা কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রায় সব মানুষের বিচারবোধ।
কমনসেন্স হচ্ছে- বাস্তবজীবনে সিদ্ধান্ত নেয়ার একটি অবস্থা এবং কোনো কাজ করলে তার পরিণতি কী হতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা করতে পারার সক্ষমতা।
“Common sense in an uncommon degree is what the world calls wisdom.”  -Samuel Taylor Coleridge

আমরা কমনসেন্স নিয়ে জন্ম নিই না। সময়ের সাথে সাথে এটা উন্নতি লাভ করে। রাস্তা পার হবার আগে দুই দিকে ভালোভাবে দেখে নেয়া, বাইরে বৃষ্টি শুরু হলে দ্রুত শুকনো কাপড়গুলো ঘরে নিয়ে আসা, ঘর থেকে বের হওয়ার আগে মোমবাতি নিভিয়ে দেয়া বা লাইট-ফ্যান বন্ধ করা, গুরুত্বপূর্ণ কাজ কমগুরুত্বপুর্ণ কাজের আগে সম্পন্ন করা -এসবই কমন সেন্স। যদিও সবার মধ্যে এই সেন্স সমানভাবে দেখা যায় না।
আরো একটি উদাহরণ দিই। যেমন- কাউকে থুথু বা কাশি ফেলতে দেখলে সবারই খারাপ লাগে। সুতরাং এ কাজটি অত্যন্ত সতর্কতা ও গোপনীয়তার সাথে করাই প্রজ্ঞাবান মানুষের কাজ। এরকম দৈনন্দিন জীবনের আমরা আরো অনেক উদাহরণ খুঁজে পাব। সেগুলো নিয়ে পরে আলোচনা করছি। এখন আলোচনা করব এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।

গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

কমন সেন্সের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনেক। প্রথমত, এটা আমাদেরকে অযৌক্তিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখে এবং আমরা কখন কী করব সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ করে দেয়।
দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে আপনি অন্যের চাওয়া সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন। যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব, সেহেতু সমাজের অন্য ব্যক্তিবর্গের চাহিদা বা চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন থাকা দরকার।
তৃতীয়ত, কমসেন্স হচ্ছে সবকিছুর ভিত্তি। আপনার যদি কমন সেন্স না থাকে তাহলে আপনার শিক্ষা-দীক্ষা বা দক্ষতার কোনো মূল্য নেই। আপনার জীবনটা হবে জঙ্গলের জীব-জানোয়ারদের মতোই।
চতুর্থত, কমনসেন্স থাকলে সব কাজ সহজ হয়ে যায়। কোনো কর্মীর কমনসেন্স ঘাটতি থাকলে এর প্রভাব পড়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর। কর্মীর পর্যাপ্ত কমনসেন্স থাকলে তাকে পরিচালনা করা সহজ হয়। তারা পুরো টিমকে সুন্দরভাবে সাপোর্ট দিতে পারে।

ব্রিটিশ একটি জরিপের কথা বলছি। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সেনসাস্ওয়াইড এ জরিপ চালিয়েছে। ৭০ ভাগ ব্রিটিশ মনে করেন- কোনো ডিগ্রির চেয়ে কমনসেন্স বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ৬৯ শতাংশ কমনসেন্সবিহীন কাউকে চাকরি দিতে নারাজ। দুই তৃতীয়াংশের বেশি লোক মনে করেন চেহারার চেয়ে সঙ্গীর কমনসেন্স বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ৪৮ শতাংশ মানুষ কমনসেন্সবিহীন কারো সাথে প্রেম করতে অনীহা প্রদর্শন করেন। ২০ শতাংশ ব্রিটিশ, কমনসেন্স কম থাকায় তার পার্টনারকে ত্যাগ করেছেন।

সবশেষ একটি সূত্র বলি-
Knowledge + Commonsense = Wisdom
Knowledge - Commonsense = Dangerous

বিভিন্ন ক্ষেত্রে কমনসেন্স

ক. বিছানায়

  • শোয়ার আগে বিছানা অবশ্যই ঝেড়ে নিন। নাহলে পোকামাকড় বা ধুলাবালিতে নাস্তানাবুদ হতে পারেন।
  • নিজের পোশাকের দিকে খেয়াল রাখুন। কাপড়ের ব্যাপারে হুশ না থাকলে প্রয়োজনে লুঙ্গিতে গিরা দিয়ে রাখুন।
  • পাশে স্বামী/স্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ থাকলে পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখুন।
  • ঘুম থেকে উঠে অবশ্যই বিছানা বা মশারি গুছিয়ে রাখুন।

খ. ওয়াশরুমে

  • অবশ্যই জুতা ব্যবহার করুন।
  • পানি আছে কি-না দেখে নিন। টয়লেটে শেষে পর্যাপ্ত পানি ঢালুন।
  • উঁচু কমোড হলে উপরে উঠে বসবেন না।
  • ওযু বা হাতমুখ ধোয়ার সময় কফ বা নাকের ময়লা মগ বা বালতিতে ফেলবেন না। ব্যবহার শেষে মগ বা বালতির পানি ফেলে দিন। কোনোভাবেই ভর্তি করে রেখে বের হবেন না।
  • বের হয়ে অবশ্যই বাথরুমের লাইট বন্ধ করুন।

গ. খাওয়ার টেবিলে

  • যেখানে বেসিনের ব্যবস্থা আছে সেখানে প্লেটে পানি ঢেলে হাত না ধোয়া ভালো। প্রয়োজনে হোস্টের অনুমতি নিন।
  • কচকচ শব্দ করে খাবেন না। ঢগঢগ শব্দে পান করবেন না।
  • মাছের কাঁটা কিংবা মাংস খেলে হাড়গোড় বা ময়লা টেবিলে ফেলবেন না। অবশ্যই নির্ধারিত প্লেটে রাখুন। প্রয়োজনে কাগজ বা টিস্যু দিয়ে রাখতে পারেন।
  • কোনো কিছু অর্ধেক বা সামান্য খেয়ে রেখে দেবেন না। কারণ আপনার খেয়ে রাখা জিনিস অন্যরা খেতে পছন্দ না করাই স্বাভাবিক।
  • একত্রে খেতে বসলে অন্যদের দিকে খেয়াল রাখুন। নিজেই সব সাবাড় করবেন না। ভা তবা তরকারির বাটি এগিয়ে দিয়ে সহায়তা করুন।

ঘ. রাস্তায়

  • রাস্তার ডান দিক দিয়ে চলার চেষ্টা করুন। সে ব্যবস্থা না থাকলে ফুটপাত দিয়ে হাঁটুন।
  • ফুটপাতে পরস্পর হাত ধরাধরি করে হাঁটবেন না।
  • চলার সময় নিজের ব্যাগ-বস্তার দিকে খেয়াল রাখুন। সেগুলো যেন অন্যকে ধাক্কা না দেয়।
  • দেখে-শুনে পথ চলুন। তাড়াহুড়া করবেন না।

ঙ. গাড়িতে

  • ধীরে-সুস্থে গাড়িতে উঠুন। তাড়াহুড়া ও ধাক্কা-ধাক্কি করে উঠতে গিয়ে নিজের জীবনটাকে হারাবেন না।
  • সিট খালি পেলে বসে পড়–ন। কারো পাশে দাঁড়িয়ে থেকে অহেতুক কাউকে বিরক্ত করবেন না।
  • বয়স্ক বা নারীদের যথাসম্ভব বসতে অগ্রাধিকার দিন। নারীদেও সংরক্ষিত সিটে পুরুষরা বসবেন না।
  • জানালা দিয়ে বাইরে হাত বা মাথা রাখবেন না।
  • জানালা খুলে মোবাইল ফোনে কথা বলবেন না। এতে যেকোনো সময় আপনার ফোনটি হারানোর আশঙ্কা আছে।
  • বন্ধু-বান্ধব বা কলিগ নিয়ে পাবলিক গাড়িতে উঠলে অযথা চিৎকার-চেঁচামেচি করবেন না। অন্যদেও বিষয়টি ভালো না-ও লাগতে পারে।
  • মোবাইলে জোরে গান বাজাবেন না। ফোনে দীর্ঘ আলাপ করবেন না। দরকারে হেডফোন ব্যবহার করুন।
  • পাশের যাত্রীর সাথে পরিচিত হতে পারেন। তবে তিনি ভালো সাড়া না দিলে অযথা বিরক্ত করবেন না।
  • পাশের যাত্রীর ফোনের ডিসপ্লের দিকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকাবেন না।
  • কেউ কোনো খাবার অফার করলে সযত্নে এড়িয়ে চলুন।
  • নামার সময় অবশ্যই বাম পা আগে দিয়ে নামুন।

চ. অফিসে

  • আপনার ডেস্ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন।
  • কাজের সময় অন্যকে আলাপে জড়াবেন না। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলবেন না।
  • প্রয়োজনীয় ফোনালাপ সংক্ষেপে সেরে নিন। আস্তে কথা বলুন। অন্যদের যেন সমস্যা না হয় – সেদিকে খেয়াল রাখুন।
  • ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে চলুন। অতিমাত্রায় হাস্যরস বা গম্ভীরভাব পরিত্যাগ করুন।

ছ. মোবাইলে

  • কাউকে ফোন করলে আগে নিজের পরিচয় দিন। আপনাকে ফোন করলে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে নিন।
  • মোবাইলে নিচুস্বরে কথা বলুন। পাশের লোকটি যাতে বিরক্ত না হয়, খেয়াল রাখুন।
  • কাউকে বসিয়ে রেখে দীর্ঘক্ষণ ফোনালাপ করবেন না।
  • আপনার চেয়ে অপেক্ষাকৃত সিনিয়র বা বিশিষ্ট কেউ ফোন করলে নিজে আগে কাটবেন না।
  • কথা শেষ করার আগে ফোন কেটে গেলে ব্যাক করে কথা শেষ করুন।
  • গাড়ির মধ্যে ফোনালাপ দ্রুত শেষ করুন। পাশের ব্যক্তির দিকে খেয়াল রাখুন।

কমনসেন্স বাড়ানোর উপায়

আমরা আগেই বলেছি যে, কমনসেন্স নিয়ে জন্ম কেউ জন্ম নেয় না। সময়ের সাথে সাথে এটি প্রাকৃতিকভাবে উন্নতি লাভ করে। মূলত পরিবেশ পরিস্থিতি ও পরিবারের থেকে মানুষের কমনসেন্স তৈরি হয়। কমনসেন্স বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই। তবে নিচের কাজগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন-
ক. কোনো কিছু করা বা বলার আগে ভাবুন- বিষয়টি আপনার সাথে হলে কেমন লাগত?
খ. অনর্থক বা বেহুদা কথাবার্তা থেকে দূরে থাকুন।
গ. প্রচুর পড়াশোনা করুন। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনী জানুন। তাদের আচরণগুলো অনুসরণ করুন।
ঘ. সাড়া দিন, প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না ( Respond. Don’t react )।
ঙ. আপনার আশেপাশের দিকে সচেতনভাবে চোখ রাখুন। বেশি বেশি দেখুন, শুনুন। কথা বলুন কম।
চ. অযৌক্তিক বিষয়গুলো ছেড়ে দিন।

About সম্পাদক

মো: বাকীবিল্লাহ। গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলার পাথরঘাটাতে। থাকেন ঢাকার সাভারে। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে -- সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে অনার্স, মাস্টার্স । পরে এলএলবি করেছেন একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর লেখালেখি মূলত: ক্যারিয়ার বিষয়ে। তারই সূত্র ধরে সম্পাদনা ও প্রকাশ করছেন ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স নামে এই ম্যাগাজিনটি। এছাড়া জিটিএফসি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে কর্মরত। ভিডিও তৈরি ও সম্পাদনা, ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন এবং পাবলিক লেকচারের প্রতি আগ্রহ তাঁর।

View all posts by সম্পাদক →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *