ফিচার কী? একটি সুন্দর ফিচার কিভাবে লিখবেন?

ফিচার লেখার নিয়ম-কানুন

আনিসুর রহমান এরশাদ:::::::

হার্ড নিউজ বা রোজকার-প্রতিদিনের খবর নয় ফিচার। নয় প্রত্যক্ষ, আঁটসাট বা স্ট্রেইটজ্যাকেট খবর। শুরুতেই মূল কথা কিংবা কে, কোথায়, কখন, কাকে, কেন, কিভাবে প্রশ্নের উত্তর সংক্রান্ত তথ্য জানাতে হয় না। যথাযথ সূত্রেরও বরাত দিতে হয় না। বিষয়বস্তু, উপাদান, লেখার কাঠামোতেও ভিন্নতা থাকে। ফিচারে ভাষায় ও বিষয়ে বৈচিত্র্য এবং গল্প বলার ধরনে অভিনবত্ব থাকতে হয়। ফিচার এমন রচনা, এমন বিবরণী যা তুচ্ছ বা নগন্য কোনো ঘটনাকেও সুখপাঠ্য করে তোলে, যেকোনো বিষয় নিয়ে যেকোনো সময়ে লেখা যায়। ফিচারও একধরনের তথ্যজ্ঞাপনকারী খবর; যা সমসাময়িক অথবা সমসাময়িক নয় কিন্তু তার সংবাদমূল্য আছে এমন ঘটনার উপর হতে পারে। ফিচারের জগৎ বিস্তৃত। আগে হার্ড নিউজ, অভিমত ও বিজ্ঞাপন বাদ দিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবি, কার্টুন, নকশা, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, চিঠিপত্র সব কিছুকেই ফিচারের আওতায় আনা হতো। ফিচারধর্মী প্রতিবেদন কোনো না কোনো মাত্রায় মানবিক আবেদনসমৃদ্ধ বিশেষ ধরনের রচনা। যা পাঠকের সাথে যোগাযোগে সক্ষম, পাঠককে কোনো না কোনোভাবে আলোড়িত করে। রমনীয় লেখা হওয়ায় ফিচার পড়ার মধ্যে সুখপাঠ্যতার স্পর্শ থাকে, পাঠকের মনকে আকর্ষিত করে, পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে শেষে মুগ্ধতার সাথে পরিতৃপ্ত করে। পাঠকদের মাঝে এর আকর্ষণ ও গুরুত্ব অনেক বেশি। অনেক পাঠক খবর পড়ার চেয়ে ফিচার পড়তে বেশি পছন্দ করেন।

ফিচার কী?

ফিচার বর্ণনামুলক, গবেষণামূলক, বর্ণিল চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ, মজাদার কথামালায় সাজানো, ঘটনার উপর বিশদ বিবরণ এবং একটা সুন্দর সমাপ্তি। থাকে- সুন্দর সুচনা, শিক্ষা, আনন্দ। মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ফিচার লেখা হয়। কঙ্কালসার হাড্ডির গায়ে মাংস বসিয়ে দেহদান করা হয় এই ফিচারে। ম্যাগাজিন, ব্লগ, ওয়েবসাইট, খবরের কাগজ, টেলিভিশনের সংবাদ এবং অন্যান্য বেতার মাধ্যমে ফিচার বেশ জনপ্রিয়। ফিচারে সমসাময়িক সময়ে ঘটে যাওয়া একই ধরনের খবরের সাথে তুলনামুলক চিত্র তুলে ধরা হয়, খবরের মধ্য থেকে কিছু বিষয়কে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

ফিচারের প্রথম লক্ষ্য মূলত মানুষের মনকে নাড়া দেওয়া, হৃদয়কে স্পর্শ করা, নাড়া দেয়া, আলোড়ন তোলা, ঝড় তোলা। ফিচার হলো a lemon turned into lemonade। ‘The Complete Reporter’ গ্রন্থে তাই বলা হয় ‘The word ‘feature’ may be one of the most overworked words in the lexicon of journalists.’ ‘নিউ সার্ভে অব জার্নালিজম’ গ্রন্থে জর্জ ফক্স মর্ট ও সহ লেখকগণ বলেন: ‘ফিচার প্রতিবেদন নিছক সংবাদের চেয়ে মানবিক আবেদন স্পর্শ দিককে বেশি প্রাধান্য দেয়, যে কারণে সাধারণ পাঠক ফিচারের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তারা এর প্রতি মনোযোগী হয়; আর এতে করে ফিচার পাঠকের আবেগকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়’।

মিশেল চার্নলি ও ব্লেয়ার চার্নলি তাদের রিপোর্টিং বইতে বলেছেন, ফিচার শব্দটি সংবাদকক্ষেও সার্বজনীন এবং সার্বক্ষণিক বুলি। তারা ফিচারকে মানবিক আবেদনসমৃদ্ধ বিবরণীকে ফিচারের একটা প্রকার হিসেবে দেখিয়েছেন। ম্যাককিনি বলেছেন-ফিচার হচ্ছে ষড় ‘ক’ এর কাঠামোর শৃঙ্খলার বাইরে অন্যভাবে রচিত বিবরণী যা মানুষের কৌতুহল, সহমর্মিতা, ভীতি, আনন্দকে উদ্দীপিত করে। ম্যাককিনি ও চার্নলি বলেছেন, সময়ানুগ নয় প্রধানত এই কারণে নির্বাচিত উপাদানের ভিত্তিতে রচিত বিবরণই হচ্ছে ফিচার। ম্যাককিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মানবিক আবেদনের ওপর আর চার্নলিরা গুরুত্ব দিয়েছেন সময় নিরপেক্ষতার ওপর।

প্যাটারসন বলেন- ফিচারও এক ধরনের সংবাদ। যা পাঠকের কাছে তথ্য তুলে ধরে। লেখা হয় দ্রুত পাঠপোযোগী চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে। ফিচার হলো অধ্যয়ন, গবেষণা ও সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত সংবাদের এক সম্প্রসারিত রূপ যার লক্ষ্য তথ্য পরিবেশন, শিক্ষাদান ও বিনোদন।

ফিচারের প্রকারভেদ

সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণার মতো অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে মানবিক আবেদনমূলক ফিচার (Human Interest Story)। এধরনের ফিচারে কেন্দ্রীয় মনোযোগ ও উপাদান হিসেবে মানবিক আবেদন প্রকাশ করা হয়। কেউ তার অভিজ্ঞতার আলোকে যে গল্প অপরের কাছে বর্ণনা করে এবং সে গল্পের মাধ্যমে অনেকে উপকৃত হয় সেই সব গল্পই হল মানব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ফিচার।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে খ্যাতিমান, গুরুত্বপূর্ণ বা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের নিয়ে ব্যক্তিত্ব চিত্রণমূলক ফিচার (Presonality Feature) লেখা হয়। অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বদের জীবনদর্শন তুলে ধরতেও এধরনের ফিচার লেখা হয়।

কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির জীবনদর্শন, অভিজ্ঞতা প্রকাশের বিবরণীকে আত্মকথনমূলক বা আত্মকথা বিষয়ক ফিচার (Auto-biographical Feature) বলা হয়; এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হয় আত্মকথন যেন মিথ্যাচারে পরিণত না হয়, পাঠক বিভ্রান্তির শিকার না হয়। কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি যদি তার জীবনদর্শন, অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন তবে ওই ধরনের বিবরণীকে আত্মকথামূলক বিবরণী বলা হয়।

স্বীকারোক্তিমূলক ফিচারে লেখক তার একান্ত ব্যক্তিগত কোনো গোপন বিষয়ের অবতারণা করেন। ফলে পাঠকের মনে বিশেষ ধরনের আবেদন সৃষ্টি হয়। ক্রীড়া বা শো-বিজের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এধরনের কৌশলের আশ্রয় নেন।

অতীতের কোনো বিশেষ দিন, ঐতিহাসিক ঘটনা, মর্মস্পর্শী বা আকর্ষণীয় বিষয় বা নিদর্শন বা ব্যক্তিকে নিয়ে ইতিহাস ভিত্তিক ফিচার (Historical Feature) লেখা হয়, অতীতকে সময়োপযোগী করে পরিবেশন করা হয়। প্রচলিত কাহিনী বা ধারণার ওপর নতুনভাবে আলোকপাত করা হয় এবং অতীতের গৌরব বা ব্যর্থতা পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। অন্ধকারে চাপা পড়া ঘটনাও পাঠক ফিচারে পান। সমাজ পরিবর্তনের ধারা যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেই সময়ের অবস্থা এবং বর্তমান অবস্থার মধ্যে একটি তুলনামুলক চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়। হতে পারে তা সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা। ঐতিহাসিক ঘটনাবলী বর্নণায় সামসাময়িক বিষয় আলোচনা করা হলেও পূর্বেকার সে সব স্থানে আর একবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় এই ফিচার। সে সময় থেকে বর্তমান সময়ের মধ্যে কী পার্থক্য ঘটেছে। আর সে কারণে সমাজে তার কী প্রভাব পড়েছে তা জানা যায়।

কীর্তিমান বা ব্যর্থ কোনো ব্যক্তির আনন্দ-বেদনার স্মৃতি ও জীবনের নানা বিষয় সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তুলে ধরে চমৎকার মানবিক আবেদন সৃষ্টি করা যায় সাক্ষাতকার ভিত্তিক ফিচারে (Interview-based Feature)

কোনো হার্ড নিউজে যখন আবেদনসম্পন্ন দিক থাকে তখন সে দিকটি ফোকাস করে সংবাদ ফিচার বা ফিচারধর্মী সংবাদ (News Feature)। সংবাদ ফিচারটি যদি মূল খবর প্রকাশের পরের দিন প্রকাশিত হয় তাহলে সেটাকে ‘সেকেন্ড ডে ফিচার’ বলে। আর ফিচারধর্মী সংবাদটি যদি মূল স্টোরির সাথেই প্রকাশিত হয় তাহলে সেটিকে ‘সাইড স্টোরি’ বলে।

মানুষকে তার পরিচিত পরিমণ্ডলের বাইরের মানুষ, বিচিত্র পেশা বা তাদের জীবনযাত্রা, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, ইতিহাস জানাতে ভ্রমণবৃত্তান্ত বা অভিযানমূলক ফিচার লেখা হয়।ঋতুকালীন বিষয়, দৃশ্যের অন্তরালে বা লোক চক্ষুর অন্তরালের বিষয়কে চলতে-ফিরতে দেখা নিয়ে এ ধরণের ফিচার হতে পারে।

খবরের পেছনের খবরের প্রক্ষাপট, কার্যকরণ সূত্র, অজ্ঞাত বা অর্ধজ্ঞাত প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে বিশেষত অপরাধ, রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, দুর্ঘটনা ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণমূলক ফিচার (Interpretative Feature) লেখা হয়।

উন্নয়নধর্মী বিষয়, উন্নয়ন সমস্যা, সম্ভাবনা, ব্যক্তি-গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য, স্থানীয় সম্পদ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে উন্নয়ন ফিচার লেখা হয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সরকার ও এনজিওগুলো, দাতাগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত সাধারণ মানুষের মনে উন্নয়ন-আকাঙ্খা জাগিয়ে তুলতে এধরনের ফিচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রোফাইল বা মুখবন্ধে একটি আলাদা ধরনের চরিত্র এবং জীবন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। একটি বিষয়ের উপর যতগুলো যুক্তি, মতামত বা কারণ থাকতে পারে তা সব আলোচনা করা হয়।

ফিচার কী, কেন গুরুত্বপূর্ণ ও কীভাবে লেখবেন?
খবরের দুনিয়া সীমিত, ফিচারের দুনিয়া সারাবিশ্বের সমস্তকিছু। বলা হয়ে থাকে- ‘The whole world is the workshop of a feature writer’।

ফিচারের বৈশিষ্ট্য

ফিচারের দুনিয়া সীমিত নয় : ফিচার সংঘটিত ঘটনা অথবা কোনো ঘটনা নয় তার উপরও লেখা যেতে পারে। কিছু না ঘটলেও ফিচার লেখা যায়। কোন ঘটনা ঘটার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। যেমন – দেশের অর্থব্যবস্থায় মুদ্রাস্ফীতি ১৫% বৃদ্ধি পাওয়া খবর। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনপ্রবাহ কতটা দুর্দশায় নেমে গেছে তা ফিচারের বিষয়বস্তু হতে পারে। তেমন কোনো খবর নয় সে বিষয়েও ফিচার লেখা যেতে পারে। যেমন – পদ্মা নদী বা কান্তজিউ মন্দিরের উপরও লেখা ফিচার। খবরের দুনিয়া সীমিত, ফিচারের দুনিয়া সারাবিশ্বের সমস্তকিছু। বলা হয়ে থাকে- ‘The whole world is the workshop of a feature writer’।

কোনো ডেডলাইন নেই : ফিচার মানুষের মনে আড়োলন তোলে, ঢেউ জাগায় হৃদয়ে, মানবিক আবেদন অপরিহার্য। ফিচারে লেখক মতামত বা দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত দিতে পারেন। খবরের মতো ইন্ট্রো বা সূচনা, পিরামিড আকৃতির মতো ধারাক্রম ফিচারে নেই । ফিচার অনুসরণ করে উল্টো পিরামিড আকৃতিতে। ফিচারে জমিয়ে লেখা চলে। ফিচার পড়ার মধ্যে একটি মানবিক আবেদন ও উপলব্ধি খবরের তুলনায় বেশি। এতে সংবাদের মতো বাধ্যবাধকতা থাকে না। ফিচারের উদ্দেশ্য হচ্ছে- অবহিত করা (To inform), শিক্ষা দান করা (To educate), আনন্দ দান করা (To entertain), উদ্ধুদ্ধ করা (To motivate). একটি ফিচারে সবগুলো উদ্দেশ্যের সমাহার দেখা যাবে তা নয়। সময়ের বিচারে ফিচারের কোনো ডেডলাইন নেই। ফিচারে মানুষের মন ছুঁয়ে যেতে হয়, সরস বিবরণ হতে হয়।

আবেদন থাকে সব সময় : ফিচারের আবেদন সময়ের সাথে সাথে ফুরিয়ে যায় না। ফিচার বস্তুত সময় নিরপেক্ষ ও চিরায়ত। এলমো স্কট ওয়াটসন ফিচারের বিষবস্তুকে চিরায়ত, সময় নিরপেক্ষ বা চিরসবুজ বলেছেন। বলেছেন – যেকোনো বিষয় নিয়ে যেকোনো সময়ে ফিচার লেখা যেতে পারে। ফিচারে তাৎক্ষণিকতা গুরুত্বপূর্ণ নয়, দেরিতে জানলেও আবেদন-উপযোগিতা হারায় না। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান বা স্থায়ী কিংবা সুপ্ত বিষয় নিয়ে ফিচার লেখা যায়। ফিচার লেখার সময় তাৎক্ষণিকভাবে কিছু ঘটার জন্য লেখককে অপেক্ষা করতে হয় না। তাৎক্ষণিক বিষয় নিয়েও ফিচার লেখা যাবে। ফিচারের বিষয়বস্তু তাজা নয়, নরম খবর, তাৎক্ষণিকভাবে পরিবেশিত হয় না। ঘটানাটি কিভাবে সংঘটিত হয়েছে তার কারণ উদ্ঘাটনের মাধ্যমে পিছনে লুকিয়ে থাকাবিষয় সমূহ ওঠে আসে।

মানবিক স্পর্শই ফিচারের প্রাণ : এলমো স্কট ওয়াটসন বলেছেন, মানবিক স্পর্শই ফিচারের প্রাণ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আবেগ বা আবেদন ধরে রাখতে না পারলে ফিচারটিই উদ্দেশ্যেই ব্যাহত হয়। ফিচার গদ্যময় রচনা হলেও এতে ফুটিয়ে তোলা যায় বিভিন্ন মাত্রার আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা ও কৌতুহল। আধুনিক সময়ে আধুনিক মানুষের মানবীয়তার চাহিদা পূরণে দরকার হয় গল্প-কাহিনী গাঁথা। সেকারণেই ফিচারের কলকাঠি মানুষের আবেগ। ফিচার পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দেয়, মনে প্রবল আবেদন সঞ্চার করে।

বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনিষ্ঠ রচনা : ফিচার অনেকটা গল্প বলার মতো তবে গল্প নয়, বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনিষ্ঠ রচনা। ফিচারকে চিত্তাকর্ষক করে তুলতে অনেক ক্ষেত্রে ছোটগল্পের কাঠামো ব্যবহার করে হয়ে থাকে। আবার ফিচার মনোরোম ও রমণীয় ভঙ্গিতে লেখা হলেও তাকে রম্য রচনা বা সরস রচনা বলা যাবে না। এর উপস্থাপনের দিক থেকে এতে নাটকীয়তারও সুযোগ রয়েছে একে কখনো কখনো কিছুটা রম্য ও ব্যঞ্জনাময় মনে হলেও বাস্তবের সাথে থাকে এর প্রত্যক্ষ সংযোগ। সফল ফিচারের দিক নির্দেশনা দেয় একটি বিশেষ প্রত্যয়; যার নাম বা ‘slant’ বিশেষ দৃষ্টিকোণ। Feature is a slanted article. বিশেষ দৃষ্টিকোণ ছাড়া ফিচার লেখক গন্তব্যহীন পথের যাত্রী।

ফিচার লেখকের করণীয়

ভালোমতো পরিকল্পনা নেয়া : তথ্য সংগ্রহ এবং ফিচার লেখার জন্য ভালোমতো পরিকল্পনা দরকার। গুছিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে, পূর্ণাঙ্গভাবে-যুক্তিযুক্তভাবে সাজাতে, স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে ও টানা গতিময় ছন্দে লেখা পরিবেশনে সাহায্য করে পূর্বপরিকল্পনা। বিষয়ের উপর জ্ঞানার্জন করতে বই পড়া, অভিজ্ঞতা অর্জন, গবেষণা অথবা মানুষের সাথে সাক্ষাত করতে হয়। গল্পের তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনটি মাধ্যম পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাতকার এবং পটভুমি গবেষণা। তথ্যসমূহ সংগ্রহের পর বর্ণিল বর্ননায় ফুটিয়ে তুলতে হয় যুক্তি তর্ক আর গল্পের আকারে। ঘটনার জট খোলার উপাদানগুলি ধারণ করা হয় ঘটনাটি ঘটার সময় সেখানে যারা ছিলেন তাদের কাছ থেকে। ঢালাওভাবে তথ্য না দিয়ে সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে হবে, ফিচার কোনো কল্পকাহিনী নয়, তথ্য প্রমাণের সমর্থন অত্যন্ত আবশ্যক। পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত না পাওয়া পর্যন্ত  ব্যক্তিগত মতামত চাপিয়ে দেন না এবং লেখার মোড় সেদিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করেন না।

পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা : শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠকের মনোযোগ-আবেগ-আবেদন ধরে রাখতে সূচনা কিভাবে করবেন ভেবে নিন, সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করুন, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করুন, বিষয়বস্তু ও রূপ-রস-গন্ধ পরিসর স্পষ্ট করে তুলুন। ফিচারের কাহিনী যেন ভাবাবেগপূর্ণ ভাষার আড়ালে চাপা না পড়ে, অতি নাটকীয় না হয়, নিজস্ব মন্তব্য বা নিজের তৈরি বাণী না থাকে, বক্তব্য বিকৃত না হয়, আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করলে বন্ধনীর ভেতর থাকে। সফট নিউজ পড়তে ভালো লাগে, আবেগ-অনুভূতিতে সাড়া জাগে, স্বস্তিদায়ক খবর। নিরস বিষয়কেও সরস করে উপস্থাপন করতে হয়।

পাঠকের মনকে সন্তুষ্ট করা : ফিচার গল্প পাঠকের মনে সন্তুষ্টির তথ্য প্রদান করে থাকে। বিনোদন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ঘটনার কারণ, স্থান, বিষয় ইত্যাদির উপর ধারণা দেওয়া হয়। এতে গুজব, মানবীয় দাবি, পারিপার্শিক অবস্থা এবং বর্ণিল বর্ণনা দেওয়া হয়। ঘটনার সচ্ছতা, নির্ভুলতা, ও যথার্থতা সংবাদমানের ওপর নির্ভর তরে। গল্পের গুণমাণ বিচার করে এর উপাদানের উপর, সংগঠন এবং কর্মদক্ষতার উপর। প্রতিটা গল্প চিত্র বা উদাহরণ- দৃষ্টান্তের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

আগ্রহের ত্রিবলয় মনে রাখা : ফিচার লেখককে আগ্রহের ত্রিবলয় Three Rings of Interest এর কথা মনে রেখে ফিচার লেখার পরিকল্পনা করতে হয়। আগ্রহের এই ত্রিবলয় হল- পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি (Editorial Policy), পাঠকের সম্ভাব্য আগ্রহ (Reader’s Presumable) ও পাঠকের প্রকৃত আগ্রহ (Reader’s Actual Interest)।

শব্দ ব্যবহারে সতর্কতা : ঝরঝরে গদ্যের আকর্ষণীয় একটি ফিচার লিখতে হলে অতিরঞ্জিত অতিকথন করবেন না। পরিচিত শব্দাবলি ব্যবহার করুন। নিজের পান্ডিত্য জাহিরের জন্য দুর্বোধ্য বা অপ্রচলিত (প্রয়োজন দেখা দিলে ভিন্ন কথা) শব্দ ব্যবহার করবেন না। শব্দের ভারে লেখাটি যাতে পাঠকের পড়তে কষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। বহুদিন ধরে বারবার ব্যবহৃত শব্দ বা শব্দাবলি ব্যবহার করবেন না। বিশেষণ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। অযথা বেশি বেশি বিশেষণ ব্যবহার করবেন না। যথাসম্ভব চমৎকার বিশেষণের প্রয়োগের মাধ্যমে লেখনীর ধার বাড়ান। সুন্দর বিশেষণ আপনার লেখার ওজন বাড়িয়ে দিবে। যেভাবে সহজে সবার সাথে লোকে কথা বলে সেভাবে লিখুন।

বাক্য ও প্যারাগ্রাফ ছোট রাখা : ছোট ছোট প্যারাগ্রাফে লেখাটি বিন্যাস করলে পাঠকের চোখ স্বস্তি পাবে। পড়তে সুবিধা হবে, কাহিনীর আকৃষ্ট করার ক্ষমতা বেড়ে যাবে। পড়ার সুবিধার্থে ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করুন ও প্যারাগ্রাফ ছোট রাখুন। বাক্য যেন অহেতুক লম্বা না হয়ে যায়। ফিচারের স্ট্যান্ডার্ড দৈর্ঘ্য ৫০০ থেকে ১০০০ শব্দ। কাহিনীর প্রয়োজন বুঝে শব্দ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। সাধারণত নিউজ পেপার ফিচার হতে পারে ৫০০ থেকে ২৫০০ শব্দে। ম্যাগাজিন ফিচার হয়ে থাকে ৫০০ থেকে ৫০০০ শব্দের মধ্যে। ওয়েব সাইটে ব্লগের ফিচার হতে পারে ২৫০ থেকে ২৫০০ শব্দের মধ্যে। ফিচার ছোট হবে নাকি বড় হবে তা নির্ভর করে সে ঘটনা ব্যক্ত করতে কী পরিমাণ যুক্তিতর্ক উপস্থাপিত হবে তার ওপর। ছোট আকারে হলেও তার মধ্যে তথ্য উপাত্ত থাকতে হবে পর্যাপ্ত। যেন গল্পটি পড়ে ঘটনার বিষয়ে পাঠক পুরোপুরি জানতে পারে। বাক্য যত ছোট হবে মনের ভাব তত বেশি পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা যাবে। বাক্যের শব্দ সংখ্যার পরিমাণে বোঝা যাবে বাক্যটি আমরা কতটুকু বুঝতে পারছি। শব্দ সংখ্যার হিসাবে বাক্য কী অর্থ নেয় তা নিচে দেওয়া হলো –

৮ শব্দ বা তার কম খুব সহজ, সহজ ১১ শব্দ, মোটামুটি সহজ ১৪ শব্দ, প্রমিত বা স্ট্যান্ডার্ড ১৭ শব্দ, কঠিন ২১ শব্দ, বেশ কঠিন ২৫ শব্দ, খুবই কঠিন ২৯ শব্দ বা তার বেশি। ফিচারে ছোট ছোট টাইট বাক্য ব্যবহারে অনেক বেশি তরতরে এবং সজীব হয়ে উঠবে লেখা।

কাঠখোট্টা ভাষা নয় : কাহিনীর প্রতি আকৃষ্ট করতে ভাষা সহজ-সরল-সাবলীল-তরতরে রাখুন। তথ্য যখন ব্যক্তির কাছ থেকে নিচ্ছেন তখন কান সজাগ রাখুন চমৎকার কিছু উদ্ধৃতির জন্য। গদ্যের চলনে যে একটি ছন্দ রয়েছে তা বজায় রাখুন। কাঠখোট্টা লেখায় পাঠকের বিরক্তি ধরে। তাই মজা করে লিখতে চেষ্টা করুন। সবসময় সহজ ভাষা ব্যবহার করা ভালো। যাতে করে সব ধরনের পাঠকই লেখাটি সহজেই বুঝতে পারে।

সুন্দর শিরোনাম দেয়া : সুন্দর ও আকর্ষণীয় শিরোনাম নির্বাচন করবেন, যা দেখেই পাঠকের মাঝে পুরো লেখাটি পড়ার আগ্রহ জন্মায়। শিরোনামটি যেন খুব ছোট অথবা বেশি বড়ও না হয়।

আকর্ষণীয় সূচনা দেয়া : গতানুগতিক ভূমিকায় বরাবরই পাঠক আকৃষ্টতা কম থাকে। চমৎকার সূচনা পাঠককে লেখার ভেতরে নেবে, ভিতরে পড়তে আগ্রহ জন্মাবে। একটি আকর্ষণীয় সূচনা দিয়েই লেখক ফিচার লিখতে শুরু করতে পারেন। সূচনাটি হতে পারে সারমর্ম সূচনা কিংবা উদ্ধৃতি সূচনা, প্রশ্ন সূচনা, চিত্র সূচনা, সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য সূচনা, ব্যতিক্রমি সূচনা ইত্যাদি। সূচনা পড়েই একজন পাঠকের জানার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। পাঠকের মনোযোগ ধরার সুযোগই হচ্ছে সূচনা। লাগসই প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহার করতে পারেন। অতীত বা বর্তমানের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখতে পেলে সেটাকেও তুলে ধরা যেতে পারে।ডিসটিংকটিভ ইনসিডেন্ট সূচনায় বিষয়বস্তুর সবচেয়ে নাটকীয় মুহুর্তটির ছবি তুলে ধরা হয়। যেন শব্দ দিয়ে ছবি আঁকা। ফিচারের বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বিশেষ ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে উদ্ধৃতি সূচনা করা যেতে পারে। খুবই প্রচলিত উদ্ধৃতি টেনে মূল বিষয়টিকে ক্লিষেভাবে উপস্থাপন করা যাবে না। বিষয়বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ যদি এমন কোনো বক্তব্য দেন যা আগ্রহোদ্দীপক তবে সেটাও ব্যবহার করা যেতে পারে। সূচনায় যখন ভাঙা ভাঙা ছোট বাক্যের সমন্বয়ে হয় তখন সেটিকে স্ট্যাকাটো সূচনা বলে। বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে সূচনা করা যায়। জেনাস ফেসড সূচনায় কাছের দূরের, ভবিষ্যত, বর্তমান ও অতীতের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য প্রদর্শনের ভিত্তিতে ফিচারের মুল বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। পিকচার সূচনায় মূল বিষয়বস্তুর চাইতে তার পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে শব্দ দিয়ে ছবি আঁকা। এটা অনেকটাই ডিসটিংকটিভ ইনসিডেন্ট-এ মতো। শুরুতেই মূল তথ্য না দিয়ে গল্পের সুর বুঝে কখনো সরল-সোজা প্রবেশ করতে পারেন, কখনো নাটকীয় অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে, কখনো সূচনা করুন মোক্ষম কৌতুকে ভরা, কখনো কখনো সাসপেন্স ভরপুর।

যথার্থ বিষয়বস্তু নির্ধারণ : ফিচার নিবন্ধ লেখার সময় বিষয়বস্তু হতে হবে যথার্থ। বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে যথাযথভাবে। শিরোনাম ও বিষয়বস্তুর মধ্যে যৌক্তিক এবং যথার্থ মিল থাকতে হবে। মিথ্যা তথ্য দেয়া যাবে না। কোনো সত্য ঘটনা কিংবা কোনো বিষয়ের বর্ণনার সমন্বিত রূপ হবে ফিচার গল্প।

পাঠককে গুরুত্ব দেয়া: পাঠকের ভালোলাগা এবং মন্দলাগা অনুধাবন করার চেষ্টা করুন, তাদের মন জয় করুন। পাঠকের পছন্দানুযায়ী আরো বেশি আকর্ষণীয় এবং মনোগ্রাহী করে উপস্থাপন করুন। ফিচার লেখক তার গল্পটি বিভিন্ন উপায়ে উন্নতি ঘটান, পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গল্পটিকে তার মতো করে সাজান। পাঠকের মন জয় করতে গল্পটি শুরু করেন নাটকীয়ভাবে। গল্পের ভিতরে গল্প সাজিয়ে তা দিয়ে মূল ঘটনায় আসেন।

ব্যক্তিগত মতামত-পর্যবেক্ষণ নয় : ফিচার লেখকের যে তিনটি মৌলিক শর্ত পুরণ করতে হবে তা হচ্ছে- অধ্যয়ন, গবেষণা ও সাক্ষাৎকার। ব্যক্তিগত কোনো পর্যবেক্ষণ দিতে যাবেন না। আপনার মতামত জানতে পাঠক আগ্রহী নয়, পাঠক চায় নিট তথ্য। তাই ব্যক্তিগত মতামত দান থেকে বিরত থাকুন। সত্য খুঁজুন, সম্ভাব্য/জড়িত সকল পক্ষের সাথে কথা বলুন, যাচাই করুন। ফিচার লেখা অনেকটা হীরা কাটার মতো কাজ। ফিচারে নিজস্ব মন্তব্য বা নিজের তৈরি বাণী না দেওয়া কর্তব্য। বক্তব্য বিকৃত না করে উপস্থাপন করতে হবে। তথ্য যখন ব্যক্তির কাছ থেকে নিচ্ছেন তখন কান সজাগ রাখুন চমৎকার কিছু উদ্বৃতির জন্য। মানুষের কথা, বাচনভঙ্গি মানুষটিকে পাঠকের কাছে জীবন্ত করে তোলে।

চমৎকার আইডিয়া দাঁড় করা : কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমস্যাটিকে একটি ধারণায় রূপান্তরিত করুন এবং তার সম্ভাব্য সমাধান, ভালো দিক-মন্দ দিক এবং আপনার পক্ষ থেকে কী করণীয় তা প্রকাশ করুন। সমস্যাটিকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি মৌলিক ও চমৎকার আইডিয়া দাঁড় করান। সম্পূর্ণ ধারণা নিয়ে এগোতে হবে, বিষয়টি সম্পর্কিত সকল ভাবনা লিখুন এবং এই ধারণাগুলোকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করুন। 

বেশি পড়া : ভালো-প্রাণবন্ত-সুন্দর লিখতে হলে পড়তে হবে, ভালো পাঠক হতে হবে। আপনি যত বেশি পড়বেন আপনার মেধা তত বিকশিত হবে। আপনি তত বেশি জ্ঞান আহরণ করতে পারবেন। আর আপনি কোনো বিষয়ে যত বেশি ধারণা রাখতে পারবেন আপনি তত সুন্দরভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে লিখতে পারবেন।

কল্পনা করা : কল্পনা করা শিখতে হবে। অনেক বিষয়েই জ্ঞান থাকতে হবে। বিভিন্ন বিষয়কে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করতে হবে। কল্পনার জগৎ যত বেশি প্রসারিত হবে তত সহজেই যেকোনো বিষয়ে সুন্দরভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করা যাবে। ফিচার অনিবার্যভাবে বস্তুনিষ্ঠ হলেও তার পরিকল্পনা ও বিন্যাসে কল্পনাশক্তির প্রয়োজন থাকে সবসময়ই। 

অতি আবেগ পরিহার : আবেগের ঢলঢলে প্রকাশ কাহিনীকে ক্লিশে করে তুলতে পারে। ফিচারের মূল উদ্দেশ্য হলো একটা কাহিনী বলা। সেহেতু কাহিনী যেন ভাবাবেগপূর্ণ ভাষার আড়ালে চাপা পড়ে না যায় সেটা দেখতে হবে, অতি নাটকীয়তা এড়াতে হবে।

নিয়মিত লেখা : যথেষ্ট পরিমাণ লেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। নিয়মিত লিখতে লিখতেই উন্নতি হবে। লেখার বিষয়ে সম্পর্কে গুগল ও ইউটিউব থেকেও স্টাডি করতে পারেন। বিষয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু ধারণা ও তথ্যসূত্র পাবার পর নিজের ভাষায় সুন্দরভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে লিখতে পারবেন। ফিচার বিষয়টি মূলত নির্ভর করে লিখনশৈলীর ওপর। ফিচার লিখতে হয় আকর্ষণীয় ঢঙে ও কায়দায়। মানুষের মনে এমনভাবে গেঁথে দিতে হয়; যা পাঠককে একই সাথে জানায়, ভাবায়, পথ দেখায়। মানবিক আবেদনধর্মী ফিচারাইজড লিখনশৈলির প্রতি আধুনিক মানুষের আগ্রহ ব্যাপক।

সঠিক বানান : বানানের দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একজন ভালো পাঠক বানান ভুল থাকলে লেখাটি পড়তে বিরক্তিবোধ করবে, পড়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। লেখার মাঝে কোনো বানানের ভুল/শুদ্ধ নিয়ে সন্দেহ হলে সাথে সাথে ‘গুগল’ অথবা ‘বাংলা অভিধান’ থেকে সার্চ করে শুদ্ধ বানানটি দেখে নিবেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই কোনো অলসতা গ্রহনযোগ্য নয়। লেখার গুণগত মান ঠিক রাখতে সঠিক বানানের বিকল্প নেই।

গঠনগত দিকেও নজর রাখা : প্রতিটি লেখার গঠনগত দিকেও নজর রাখা আবশ্যক। অনেকেই আছেন যারা তাদের লেখায় দু’লাইন পর পর এক লাইন স্পেস দিয়ে লিখে থাকেন। আবার অনেকেই কোনো স্পেসই রাখেন না। এভাবে যেকোনো লেখাই গঠনগত দিক থেকে তার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে। গঠনগত দিক থেকে আপনার লেখাটি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে স্টেপ বাই স্টেপ এক লাইন স্পেস রাখাটা জরুরি।

যতি চিহ্নের যথাযথ ব্যবহার : যতি চিহ্নের সঠিক ব্যবহারের দিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। একটি ভুল যতি চিহ্ন ব্যবহারের কারণে একটি বাক্যের পুরো অর্থই বদলে যেতে পারে। একটু পর পর একাধিবার (…/??/!!) যতি চিহ্ন ব্যবহার করলে লেখা গাঠনিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো যতি চিহ্ন ব্যবহার করা যাবে না। কোনো লেখাতেই কখনই একই সাথে সাধু, চলিত বা আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করবেন না। তবে কোনো গল্পের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চরিত্রের কথোপকথন বিভিন্ন ভাষায় হলে অবশ্যই কোটেশন (” “) ব্যবহার করবেন। অর্থাৎ আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করলে বন্ধনীর ভিতর প্রমিত শব্দটি ব্যবহার করতে হবে। 

ছন্দময় সমাপ্তি : শেষটাতে সূচনাকেই ভিন্নভাষায় জোরদার করে বলা যায় কিংবা ফিচারটির মূলকথা সারসংক্ষেপ করে বলা যায় কিংবা চমকপ্রদ কোনো তথ্য দিয়ে পাঠককে ভাবনার খোরাক জুগিয়ে অতর্কিতে সমাপ্তি টানা যায়। উল্লিখিত বিষয়টি সুন্দর ও সাবলীল শব্দগুচ্ছ দ্বারা শুরু থেকে শেষ অবধি পরিছন্নতা বজায় রাখুন। একেবারে শেষে সেই বিষয়ের মূলভাবের উপর ভিত্তি করে উপসংহার হিসেবে কিছু ছন্দময় বাক্যের দ্বারা আপনি আপনার লেখাটি সমাপ্তি করতে পারেন। 

রিভিশন দেয়া : ফিচার গল্প লেখার জন্য লেখকের হাতে থাকে পর্যাপ্ত সময় ও উন্নয়নের সুযোগ। তাই যা লিখলেন তা প্রকাশ করার পূর্বে অবশ্যই একাধিক বার রিভিশন দিয়ে নিবেন। কারণ লেখার সময় বানানে বা অন্য কোনো অপূর্ণতা থাকতে পারে। একাধিক বার রিভিশন দিলে আপনার লেখাটিতে কোনো টাইপিং মিস্টেক বা কোনো অপূর্ণতা থাকলে তা শুধরে নিতে পারবেন। যা সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে- ফিচার লেখকদের লেখা পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। সমাজের ইতিবাচক দিক হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরে। গল্পে উঠে আসে মানবিক আবেদন, আলোচনায় আসে সামাজিক উদ্যোগ ও উদ্যোক্তারা। ফিচারের কারণে অনেক উদ্যোক্তারা বনে যান তারকা। অথচ তারকা বানানোর নায়ক ফিচার লেখকরা সবসময় রয়ে যান পর্দার আড়ালে। দৈনিক পত্রিকায় যেদিন ভালো ফিচার আইটেম থাকে, ওইদিন পত্রিকার কাটতি বাড়ে। ফিচার এমনভাবে লেখতে হবে যে- ‌’ফিচারের সূচনা থাকবে পরিষ্কার, বিবরণ থাকবে বিশাল ও পরিসমাপ্তি থাকবে সুন্দর।’

About আনিসুর রহমান

আনিসুর রহমান। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স ম্যাগাজিনটির নির্বাহী সম্পাদক । এক যুগ ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত।

View all posts by আনিসুর রহমান →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *