একটি ভালো প্রতিবেদন যেভাবে লিখবেন

আনিসুর রহমান এরশাদ:::::::::

সম্পাদনার টেবিলে যারা থাকেন তারা প্রতিবেদকের কাছ থেকে তথ্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রত্যাশা করেন। একজন রিপোর্টার এমনভাবে প্রতিবেদন তৈরি করবেন যেন তাতে কেউই লাল-নীল কালির আঁচড় দিতে না পারেন। সহ-সম্পাদকের কলম যত কম একটি প্রতিবেদনের ওপর চলবে তত ভালো প্রতিবেদন সেটি; সেই প্রতিবেদকের কদরও বেশি। একটি প্রতিবেদনে অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতা-সমস্যা-ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। সেসব সতর্কভাবে কাটিয়ে উঠতে পারলে একটি সাধারণ রিপোর্টও সৃজনশীল চিন্তা ও বিষয়-বৈচিত্র্যের জন্য অসাধারণ হয়ে ওঠতে পারে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে প্রচুর পরিসংখ্যান থাকে কিন্তু পরিসংখ্যানগুলো কাদের তা উল্লেখ থাকে না। কিছু প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বক্তব্য থাকে না অথচ বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনে একতরফা বক্তব্য স্থান পেতে পারে না। বর্ণনার ভাষা যদি রিপোর্টারের ভাষার মতো না হয়, অনেক বেশি তথ্যের সন্নিবেশের পরও তথ্যবিন্যাস ঠিকমতো না হলে, সোর্স উল্লেখ না থাকলে সেই প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য বিবেচিত হয় না।

তথ্য স্ট্রং করতে সোর্স উল্লেখ করুন

অফিসিয়াল সোর্সের বক্তব্য উল্লেখ করতে পারাটা ভালো। ‘অভিজ্ঞ মহল’ ‘অভিজ্ঞজন’ বলে কোনো সোর্স নেই, সোর্স নির্দিষ্টভাবেই উল্লেখ করা উচিৎ। সোর্স পোক্ত না হলে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সময় সচেতন থাকতে হবে। গুরুতর অভিযোগ থাকলে অপরাধ প্রতিবেদন রচনার কলাকৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন, পুলিশের বক্তব্যও থাকা দরকার। ভাষাগত ভুল যাতে না হয় সেজন্য খুবই সতর্ক থাকতে হবে। ‘জানা গেছে’, ‘সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন’, ‘অনেকে অভিমত দিয়েছেন’, ‘কয়েকজন ব্যবসায়ীর মতে’, ‘বিশিষ্ট আইনবিদ জানান’, ‘অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে’- এ জাতীয় শব্দগুচ্ছ সূত্র উল্লেখ করার যথার্থ বিকল্প হতে পারে না। এসব শব্দগুচ্ছ প্রতিবেদনের বস্তুনিষ্ঠ চরিত্র খুব একটা স্পষ্ট করে না। পরিচয় না দিয়ে প্রতিবেদক যে নিজের কথা অন্যের মুখ দিয়ে বলাচ্ছেন না তা কী করে বোঝা যাবে? ‘কেউ কেউ’, ‘কিছু কিছু’, ‘পক্ষপাতী যারা’- এ সবই খুব অস্পষ্ট টার্ম। প্রতিবেদন যতই গুরুত্বপূর্ণ-তাৎপর্যপূর্ণ হোক না কেন তথ্যবহুল ও স্ট্রং ইন্ট্রো না থাকলে তা অসম্পূর্ণ এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া অপূর্ণাঙ্গ।

কখনোই ঢালাও মন্তব্য নয়

সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কখনোই ঢালাও মন্তব্য করা ঠিক নয়; ঢালাও মন্তব্যে রিপোর্ট দৃঢ় হয় না, নানান বিপদ আসতে পারে। দুর্বল ইন্ট্রো অতিদীর্ঘ হলেও তা দিয়ে সুন্দর রিপোর্ট হয় না, ভাষা দুর্বল হলে নাতিদীর্ঘ ইন্ট্রো যুৎসই হয় না। ভাষাকে টাচি করতে না পারলে পাঠকের মানবিক আবেদনে নাড়া দেবার মতো প্রতিবেদন তৈরি করা যাবে না। প্রতিবেদনে বড় বড় ইংরেজি কোটেশান দেয়া যাবে না, আইনের উদ্ধৃতিগুলো প্রয়োজনে চুম্বক অংশ বাংলায় অনুবাদ করে দিতে হবে। আইনের উপধারাগুলো বাংলা করলে পাঠককে বোঝানো সহজ, বেশি পাঠযোগ্য হয়। আরো অনেক উপায় আছে- এরকম না বলে কী ধরনের উপায় কোনো ইন্ডিকেশন থাকা ভালো। তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন অবশ্যই আছে তবে তা যাতে অতিরঞ্জিত না হয়। তথ্যের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না।

সূচনা হবে সংক্ষিপ্ত কিন্তু সমৃদ্ধ

সাবজেক্ট বাছাই চমৎকার হতে হবে। ইন্ট্রো লেখার ক্ষেত্রে দুর্বলতা, কাঠামোগত ও ভাষাগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। ভাষায় গতিশীলতা না থাকলে ভালো প্রতিবেদন লেখা হয় না। সাবজেক্ট ভালো না হলে অনেক খাটাখাটনি করেও মানের রিপোর্ট তৈরি হবে না। স্টোরিতে ইন্ট্রো যথার্থ ও ভালো হতে হবে। ইন্ট্রো ২০/২২ শব্দের মধ্যে হওয়া স্টান্ডার্ড, স্পষ্ট ও সরাসরি হওয়া বাঞ্ছনীয়। খুব প্রয়োজনীয় অংশই ইন্ট্রোতে থাকার নিয়ম। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য দিয়েই সূচনাটি সাজানো যায়। অর্থাৎ সূচনাটি হবে সংক্ষিপ্ত কিন্তু অনেক বেশি সমৃদ্ধ। ইন্ট্রোতেই ‘সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা’ জাতীয় শব্দগুচ্ছ ব্যবহারে রিপোর্ট দুর্বল হয়ে পড়ে। আধুনিক যুক্তি হচ্ছে- যাকে উদ্ধৃত করা হবে তার নাম পরিচয় বলতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া এটিই রীতি।

ইন্ট্রোর সমর্থনে থাকতে হবে তথ্য

ইন্ট্রোতে ক্ল্যারেটি দরকার, তবে যত ভালো সূচনাই হোক বেশি বড় হলে তা মান হারায়। সূচনাকে খুব গুরুত্ব দিতে হবে; যাতে এমন না হয় যে তথ্যগুলো সূচনায় আসা উচিৎ ছিল তা আসেনি। আর যে তথ্যগুলো সূচনায় আনা ঠিক হয়নি তা-ই সূচনায় এসেছে। শুরুটা ঠিক না হলে বাকিটা পড়ার আগ্রহই জাগবে না। ইন্ট্রোবিহীন বিশাল প্রতিবেদনে পাঠক আকৃষ্টও হয় না, প্রতিবেদনও পূর্ণতা পায় না। ইন্ট্রোর সমর্থনে অবশ্যই তথ্য থাকতে হবে। খুব অস্পষ্ট ও এলামেলো ইন্ট্রো প্রতিবেদনকেই মানহীন করে। এমন হওয়া যাবে না- ২/৩ প্যারা পড়ে ফেলার পরও বোঝা যাবে না রিপোর্টের ইন্ট্রো কী বা রিপোর্টার কী বোঝাতে চেয়েছেন। ফিচারধর্মী প্রতিবেদন হলে ভিন্ন কথা, ফিচারে তো ইন্ট্রো পেছনে থাকে।

পরস্পর বিরোধী তথ্য নয়

তথ্য যাতে পরস্পর বিরোধী হয়ে না যায়। দেখতে হবে যেন রিপোর্টে স্ববিরোধী কোনো বক্তব্য না থাকে। বিভ্রান্তিকর কোনো রিপোর্ট করা পেশাদার আচরণ নয়। অতিকথন পরিহার করলে প্রতিবেদনের ওজন বাড়ে। এছাড়া রিপোর্টের ফলোআপ করা যে একটি আবশ্যিক বিষয় এটিও প্রতিবেদককে মনে রাখতে হবে। বিশেষ করে সিরিজ রিপোর্টে তথ্য ও ধারা-বর্ণনা পাঠযোগ্য ও কৌতূহলোদ্দীপক হতে হবে। রিপোর্টে নানান প্রশ্ন তোলাই যথেষ্ট নয়, প্রশ্নের ব্যাখ্যা বা প্রমাণভিত্তিক তথ্য থাকতে হয়। অযাচিতভাবে কোনো প্রসঙ্গ আনা যাবে না। সূচনা যে বিষয় নিয়ে করা হয়েছিল তার সাথে সম্পর্কহীন কোনো প্রসঙ্গ যাতে না আসে, রিপোর্টের শুরুর মেজাজটি যাতে নষ্ট হয়ে না যায়। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যেমন গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করতে হবে, গুরুত্বহীন তথ্য তেমনই সচেতনভাবে এড়িয়ে যেতে হবে। কেউ যাতে বলতে না পারে- প্রতিবেদনটি সুসংগঠিত নয়, এই শব্দটি/বাক্যটি/প্যারাটি এখানে খাপ খায় না।

ভাষার দুর্বলতা নয়

প্রতিবেদনে প্রচলিত ধারার কাঠামো ও বিন্যাস অনুসরণই যথেষ্ট নয়, ভাষার দুর্বলতাও থাকা যাবে না। ভেতরে অপ্রয়োজনীয় কথা রেখে প্রতিবেদনকে মেদযুক্ত বানানোর দরকার নেই। শিরোনামের মধ্যে প্রতিবেদকের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। হেডিং-এর নাটকীয়তা আকর্ষণ বাড়ায়। অনেক পাঠক রিপোর্টে হেডিং ছাড়া কিছু পড়েন না। তাই বলে শিরোনাম চমৎকার বা আকর্ষণীয় করতে যেয়ে যাতে এমন না হয় যে- শিরোনামে যে কথা বলা হলো, বডিতে সে রকম কোনো তথ্য পাওয়া গেল না। খবরের একটি সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু শিরোনামে প্রকাশ পায়। শিরোনাম দেখেই পাঠক সিদ্ধান্ত নেন, খবরটি তিনি পড়বেন কি-না। তাই প্রতিবেদনের বডি টেক্সটের মূল প্রসঙ্গের সাথে শিরোনামের সম্পর্ক যাতে থাকে।

পাঠক যাতে ধৈর্য না হারায়

তথ্য বিন্যাসের ক্ষেত্রে ধারাক্রমে এগুতে হবে, যাতে পাঠক ধৈর্য না হারায়। প্রয়োজনে উপশিরোনাম ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তা সব ধরনের রিপোর্টের জন্য আদর্শ বা অনুকরণীয় হবে না। প্রতিবেদনে শুরুতেই বক্তব্য না দেয়াই ভালো। তবে বক্তব্য সর্বস্ব রিপোর্ট হলে ভিন্ন কথা। বক্তব্য সর্বস্ব রিপোর্ট হলেও খেয়াল রাখতে হবে ইন্ট্রো যাতে বেশি ফ্ল্যাট হয়ে না যায়, অনাকর্ষণীয় না হয়; আর বক্তব্য যাতে স্পষ্ট হয়। তবে বক্তার বক্তৃতা নির্ভর রিপোর্টেও কাঠামোগত দুর্বলতা খুব বেশি প্রকট যাতে না হয়, সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। যেকোনো উপায়ে রিপোর্ট যাতে ব্যালান্সড হয় সেজন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। রিডার ফ্রেন্ডলি না হলে, মিনিং ক্লিয়ার না হলে ভালো রিপোর্ট হয় না।

রিপোর্টের রিডেবিলিটি ক্ষুণ্ন নয়

সাবজেক্ট ম্যাটার যতই অসাধারণ হোক প্যারাগুলো অস্বাভাবিক বড় করা ঠিক নয়, এতে রিপোর্টের রিডেবিলিটি ক্ষুণ্ন হয়। প্রয়োজনে প্যারা বাড়ানো যেতে পারে। বড় বড় প্যারায় লেখা প্রতিবেদন চোখকে পীড়া দেয় এবং পড়তে কষ্ট হয়। লজিক্যাল চেইন বজায় রেখে ছোট ছোট প্যারায় ভাঙাটাই ভালো। ভালো প্রতিবেদনের বডিতে অপ্রয়োজনীয়, বেশি সাধারণ ও অবিন্যস্ত তথ্য থাকে না। ভালো আইটেমও ধারাবাহিকতা না থাকায় আবেদন হারিয়ে ফেলে।

পাঠক যাতে বিরক্ত না হয়

প্রতিবেদনে তথ্য থাকতে হবে পরিমিত, সংখ্যাগত তথ্য বেশি থাকলে তা পাঠককে বিরক্ত করে। তথ্য ও বিশেষজ্ঞ মতামত থাকলেও কাঠামোগত বিন্যাসে সমস্যা থাকলে মানহীন প্রতিবেদন তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞ মতামত সবার শেষেও থাকতে পারে, তবে বিশেষজ্ঞ মতামতের ওপর ভিত্তি করেই প্রতিবেদন তৈরি হলে তা ভিন্ন। তারপরও প্রতিবেদকের নিজের কোনো অনুসন্ধান ছাড়া শুধু একজনের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব রিপোর্ট হয় না। নির্দিষ্ট একটি অভিযোগকে সামনে রেখেই যে প্রতিবেদন শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত করারই যাবতীয় চেষ্টা চলে- সেই প্রতিবেদন অনেক সময় বিরক্তি উদ্রেক করে।

পাঠকের জন্য সহজ করে লিখতে হবে

স্টোরিতে ইন্ট্রোর সাথে নেক-এর সংযোগ না থাকলে ভালো প্রতিবেদন হয় না। নেক- এর তথ্য যাতে বিক্ষিপ্ত মনে না হয়। থাকতে হবে- চমৎকার সংবাদ সূচনা, করতে হবে- যথাযথ সূত্রের সাথে আলাপ, এক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অন্য সূত্রের সাথে যাচাই। তথ্য কোথা থেকে এলো তা স্পষ্ট করা জরুরি। সাধারণ পাঠকের জন্য সহজ করে লিখতে হবে, জটিল বাক্য ও দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার পরিহার করতে হবে। দীর্ঘ বাক্য ব্যবহৃত হওয়ার কারণে অর্থ দুর্বোধ্য হয়ে যায়। বাক্য গঠনে ত্রুটি বা ভাষার জড়তা যাতে না থাকে, বিরাম চিহ্ন ব্যবহারেও ত্রুটি থাকা যাবে না। বর্ণনা সুন্দর হতে হবে, সূচনা অহেতুক দীর্ঘ করা যাবে না। সংখ্যাগত তথ্যের সমাবেশ ও খটমটে শব্দের ব্যবহার মনোযোগ নষ্ট করে, তাই মনগড়া তথ্য-পরিসংখ্যান না দিয়ে প্রকৃত পরিসংখ্যান দিতে হবে।

পক্ষপাতিত্ব করবেন না, অতি আবেগ পরিহার করুন

প্রতিবেদক সৎ ও সংবেদনশীল হবেন, পাঠকের মন নাড়া দিতে ভাষা ব্যবহারে অতিমাত্রায় আবেগী হবেন না বা পক্ষপাতিত্ব করবেন না। রিপোর্টারের সরাসরি মন্তব্য ও নিজস্ব পরামর্শ প্রতিবেদনে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সংশ্লিষ্ট মহল বা পর্যবেক্ষকের নামে মন্তব্য জুড়ে দেয়া রিপোর্টের অঙ্গহানি করে। রিপোর্টার তো বিশেষজ্ঞ নন, মন্তব্য রিপোর্টার করতে পারেন না। ভাষা ও বিশেষণের ব্যবহার যাতে এমন না হয় যে রিপোর্ট দেখে মনে হবে রিপোর্টার ঘটনাটিকে যেভাবে দেখতে চেয়েছেন সেভাবেই স্টোরিটি সাজিয়েছেন। স্পর্শকাতর বিষয়ে এত বেশি যুক্তি ও পয়েন্ট তুলে ধরার দরকার নেই, যাতে রিপোর্টারকে গোয়েন্দা মনে হয়। বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনে প্রতিবেদক নিজে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারেন না।

তথ্যের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে নিন

তুলনার কারণে যেসব রিপোর্টের নিরপেক্ষতা হারায়, সেসব ক্ষেত্রে তুলনার কোনো দরকার নেই। জল্পনা-কল্পনা পাঠযোগ্য হলেও রিপোর্টে অপ্রয়োজনীয়। ধারণার ওপর নির্ভর করে সুড়সুড়ি দেয়া স্টোরি তৈরি করা যায়, গল্প লেখা যায়, ভালো রিপোর্ট হয় না। পাঠকের মনোরঞ্জনকারী তথ্য প্রদানের পূর্বে প্রতিবেদককে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। বর্ণনা যাতে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং অতিমাত্রায় ব্যাখ্যামূলক না হয়। রিপোর্ট পড়তে পড়তে যতই সামনে এগুনো হোক, যাতে কখনোই এটি মনে না হয় যে- রিপোর্টের মূল ফোকাস দূরে সরে গেছে।

রিপোর্ট বড় করার প্রবণতা বাদ দিন

প্রতিবেদন যাতে খুব ডিস্টার্বিং না লাগে। যদি প্রচলিত নামের পাশে বৈজ্ঞানিক নাম অনেক বেশি ব্যবহার হয়, সঠিক শব্দ ব্যবহার না হয়, ভিন ভাষায় উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয় তা সুখপাঠ্য হবে না। অতিরিক্ত ও ভুল শব্দ ব্যবহার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই তথ্য বারবার না দিলে রিপোর্ট স্ট্রং হয়। একই তথ্য একাধিকবার দিলে রিপোর্ট ছোট করা কঠিন হয়ে পড়ে। খুঁটিনাটি তথ্য বেশি দিয়ে রিপোর্ট বড় করার প্রবণতা বাদ দিতে হবে।

প্রতিবেদন যাতে হালকা হয়ে না যায়

কোনো প্রতিবেদনে যদি বহু সমস্যার কথা বলা হয়, বহু প্রশ্ন উত্থাপিত হয় কিন্তু সমস্যার সমাধানের কোনো চিন্তা-ভাবনা-পরিকল্পনা সংক্রান্ত বক্তব্য-মন্তব্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের না থাকে তাহলে প্রতিবেদন হালকা হয়ে যায়। অভিযোগ উত্থাপন করা অথচ অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য না দেয়া পক্ষপাতদুষ্ট রিপোর্ট। কোনো রিপোর্টে রিপোর্টারের পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট হলে তা একবারেই অগ্রহণযোগ্য।

রিপোর্ট স্মুথ করতে লেখা শেষে কয়েকবার পড়ুন

যদি প্রতিবেদনের বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়া যায় তবে সূচনাতেই Findings বা Recommendation আসতে পারে। অবশ্যই বিষয়টি পরিষ্কার হতে হবে। যদি প্রতিবেদনে নানান প্রসঙ্গ আসে তবে এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে বা নতুন প্রসঙ্গে যেতে সাবহেডিং দেয়া যেতে পারে। রিপোর্ট লেখা শেষ হলে বারবার পড়ে আরো স্মুথ করতে হবে, কোথাও ছন্দপতন হয়ে থাকলে ঠিক করতে হবে। অবান্তর তুলনা ভুলেও করা যাবে না।

খটমটে একটি লাইনও যাতে না থাকে

ভালো প্রতিবেদন মানে- সময়োপযোগী প্রতিবেদন, সুলিখিত প্রতিবেদন, তথ্য বিন্যাস চমৎকার। অপ্রাসঙ্গিক কোনো প্যারা দূরে থাক, একটি বাক্যও রাখা যাবে না। নানান মন্তব্যধর্মী ইঙ্গিত কিংবা ইঙ্গিতপূর্ণ বাক্য ব্যবহার না করে সোজাসুজি বলতে হবে। খটমটে একটি লাইনও যাতে না থাকে। একই ধরণের শব্দের পরপর ব্যবহার যৌক্তিক নয়। সূত্র উল্লেখ না করে যতই তথ্য দেন তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

ফলোআপ প্রতিবেদনে ঘটনাটির রিক্যাপ করুন

ফলোআপ প্রতিবেদনে অন্তত শেষের প্যারায় ঘটনাটির রিক্যাপ করা দরকার। দীর্ঘ বিলম্বিত ফলোআপ রিপোর্টে মূল ঘটনাটি কবে, কোথায়, কখন, কিভাবে ঘটেছিল তা উল্লেখ করে দিলে পাঠকের স্মরণ করতে সুবিধা হবে অর্থাৎ পূর্বের প্রতিবেদনের কিছুটা উল্লেখ করা প্রয়োজন। কোনো সমীক্ষা উল্লেখ করলে তা কাদের, কবে করা, কী পদ্ধতিতে তৈরি- তা না জানালে পাঠক মনে করবে রিপোর্টারের নিজের বক্তব্য সমীক্ষার নামে তুলে দেয়া হয়েছে। একজন গবেষকের গবেষণার ফলাফল কিংবা একটি প্রবন্ধের তথ্য নিয়েও রিপোর্ট করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে প্রবন্ধে উল্লেখিত সমস্যা-সম্ভাবনা-পরিসংখ্যান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা কোনো পাঠকের মন্তব্য নিয়ে খবর বানাতে হবে।

দায় সারা রিপোর্ট নয়

কারো কথা উদ্বৃত করলে বা কারো ইন্টারভিউ নিলে সে কে, তার পরিচয় দিতে হবে। নাম পরিচয় থাকা অবশ্যই উচিৎ। পরিচয় না থাকলে পাঠক ইনটিমেট ফিল করবে না। তুলনামূলক বক্তব্য দেয়া হলো অথচ তথ্যভিত্তিক তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপিত না হওয়া বড় দুর্বলতা। বিশ্লেষণ হতে হবে সূক্ষ্ম, অনুসন্ধান হতে হবে জোরালো, তুলনার ক্ষেত্রে তুলনামূলক পরিসংখ্যান দিতে হবে। একেবারেই সাদামাঠা সহজ রিপোর্ট বা দায় সারা রিপোর্ট দিয়ে রিপোর্টারের দক্ষতা প্রমাণিত হয় না।

সরাসরি অভিযোগ আনবেন না

একটি খাতের সব সমস্যা নিয়ে একটি রিপোর্ট যথেষ্ট নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে একটি বিশেষ সমস্যাকে মূল বিষয় ধরে সমস্যা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে রিপোর্ট করা যেতে পারে। ছোট ছোট কয়েকটি রিপোর্ট হতে পারে। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো দাবিও প্রতিবেদকের নিজ থেকে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে উপস্থাপন করাতে হবে। যেসব প্রতিবেদনে পদে পদে মানহানি মামলার আশঙ্কা থাকে, সেসব প্রতিবেদনে সরাসরি অভিযোগ আনা রিপোর্টারের পক্ষে অনুচিত। গোয়েন্দা স্টোরি বানানো প্রতিবেদকের কাজ নয়, পুলিশি ডিটেকটিভের কাজ সাংবাদিকতার নীতি বিরুদ্ধ।

অপ্রয়োজনীয় অংশ অনায়াসে বাদ দিন

আপনি যে রিপোর্টই করেন আর যে সাংবাদিকতাই করেন দায়সারা ফাঁকিবাজি রিপোর্ট কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। আকস্মিক চেষ্টায় ভালো রিপোর্ট হয় না, খাপছাড়া লেখা হয়। যে রিপোর্টটি কোনোভাবেই ছাপার বা প্রকাশের যোগ্য নয় তা প্রকাশের মাধ্যমে প্রকাশনার মান খারাপ হয়। তাই প্রয়োজনে রিপোর্ট প্রকাশের আগে রিপোর্টারের কাছে ফেরৎ পাঠানো দরকার হতে পারে। ইন্ট্রো ছোট ও কম্প্যাক্ট করার স্কোপ কাজে লাগিয়ে কিংবা অপ্রয়োজনীয় অংশ অনায়াসে বাদ দিয়ে রিপোর্টকে বেশি স্মার্ট করা যায়। রিপোর্টিং টাইমিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোন সময়ে মানুষের মনোযোগ কোন দিকে তা বুঝতে পারতে হবে। প্রতিবেদন যাতে একবার পড়েই বোঝা যায়, কষ্টকর না হয়।

পরিশেষে বলা যায়- প্রতিবেদন না প্রকাশ করলে প্রতিবেদকের মন খারাপ হয়; অথচ তিনি ভাবেন না- অভিযোগ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সাথে সরাসরি আলাপ না করে থাকলে তা সম্পাদনার টেবিলে ঠিকই ধরা পড়ে। স্পট ভিজিট না করে ঘরে বসে নানা অভিযোগের ভিত্তিতে রিপোর্ট তৈরি করলে তাও বোঝা যায়। সুপারিশে বা অনুরোধের কারণে প্রকাশের পর যেসব প্রতিবেদনে অনেক সংশোধনী আসে, সেসব প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়। একবার কোনো প্রতিবেদকের ব্যাপারে খারাপ ধারণা তৈরি হয়ে গেলে পরে তার অনেক রিপোর্টও বাদ পরে যায়।

About আনিসুর রহমান

আনিসুর রহমান। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। ক্যারিয়ার ইনটেলিজেন্স ম্যাগাজিনটির নির্বাহী সম্পাদক । এক যুগ ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত।

View all posts by আনিসুর রহমান →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *