Home » খেলাধুলায় ক্যারিয়ার » বল ও লাঠির সুক্ষ্ম দক্ষতার খেলা গলফ

বল ও লাঠির সুক্ষ্ম দক্ষতার খেলা গলফ

বল আর লাঠির খেলার জনপ্রিয় একটি খেলা হলো গলফ। ঐতিহাসিকের মতে প্রাচীন রোমান খেলা পাগানিকা, অন্যমতে অষ্টম ও চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে চীনের চুইওয়ান খেলাই গলফের পূর্বসূরি। তবে বহুল স্বীকৃত মত অনুযায়ী, আজকের গলফের উদ্ভব দ্বাদশ শতাব্দীতে স্কটল্যান্ডে। সেখানে পুরোনো মাঠে মেষপালকেরা খরগোশের গর্তে পাথর লাঠি দিয়ে মেরে ঢোকাতো। বাংলাদেশে এই খেলার শুরু হয় পঞ্চাশের দশকে। পুরোপুরি জনপ্রিয় না হলেও বর্তমান সময়ে আগ্রহ জন্মেছে অনেক খেলাপ্রিয় মানুষের মনে। আপনিও পারেন এই খেলায় ক্যারিয়ার গড়তে । এর জন্য প্রয়োজন নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। শুধু দরকার কঠোর অনুশীলন আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি।  লিখেছেন তালহা বিন জসিম

গলফ খেলা কী ?
গলফ হল বল ও লাঠির সুক্ষ্ম দক্ষতার খেলা। সহজ করে বলা যায়- গলফ খেলার লক্ষ্য হলো বলটাকে গর্তে ফেলা। সাধারণত গর্তের সংখ্যা ৯ বা ১৮টি হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতাটা হলো, কে কত কম শটে ১৮টা গর্তে বল ফেলার কাজ শেষ করতে পারে। প্রতিটা গলফ কোর্সে এই শট সংখ্যার একটা আদর্শ মান দাঁড় করানো আছে; এটাকে বলে পার।  সাধারণত মানসম্পন্ন গলফ কোর্সে পার হয় ৭১। বিজয়ী হলো সেই খেলোয়ার যিনি সবচেয়ে কম শটে বল গর্তে ফেলতে পেরেছেন ।

গলফ মাঠ
গলফ মাঠকে সাধারণত গলফ কোর্স বলে। একটি গলফ মাঠ আসলে অনেকগুলি পরপর গর্ত ও টি-এলাকার সমাহার। টি এলাকা হলো যেখান থেকে প্রথমবার বল শট দেওয়া হয় । আর এই গর্ত ও টি-এর মাঝে থাকে ফেয়ারওয়ে বা ভালো পথ। রাফ বা জঙ্গল, হ্যাজার্ডস বা প্রতিবন্ধকতা আর পাটিং গ্রিন বা সবুজ যা কিনা পতাকা দণ্ড দেওয়া গর্তের চারদিকে থাকে। গোটা মাঠে ঘাসের উচ্চতার তারতম্য খেলোয়াড়ের দক্ষতার পরীক্ষা নেয়। অনেক সময় টি-এলাকা থেকেই গর্ত সরাসরি দেখা যায়। আবার অনেক সময় মাঠের নকশা এমন ভাবে করা হয় যে, কুকুরের হাঁটুর মতো গর্ত, টি-এলাকা থেকে ডান বা বাম দিকে বেঁকে থাকে। কখনো এই বাঁক দু’বার থাকে, যাকে বলে ‘ডাবল ডগলেগ’। সাধারণত গলফ মাঠে ১৮টি গর্ত থাকে। তাই ৯ গর্তের মাঠে খেলোয়াড়কে দু’বার পাক দিতে হয়। খেলোয়াড়েরা হেঁটে বা স্বয়ংক্রিয় যানে  চড়ে মাঠে চলাচল করতে পারেন।

নিয়মাবলী
একজন গলফারের পেশাদারিত্বের নিয়ম ভীষণ কড়া। যদি কোনো ব্যক্তি কখনো খেলা শেখানোর জন্য বা গলফ খেলার জন্য অর্থগ্রহণ করে, তাহলে সেই ব্যক্তিকে পেশাদার বিবেচনা করা হবে। তিনি আর কোনো অপেশাদার খেলায় অংশ নিতে পারবেন না। অপেশাদার গলফারেরা কখন কত মূল্যের পুরষ্কার পাবেন তার সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে।
সুনির্দিষ্ট ক্রমানুসারে ১৮টি গর্তে খেলে একটি গলফ খেলা সম্পূর্ণ হয়। একটি গর্তের জন্য খেলা শুরু হয় টি-এলাকা থেকে গলফ দণ্ড দিয়ে বল মেরে। গলফার বলটি গর্তে ফেলার জন্য বল থামার পর যতবার খুশি মারতে পারেন। এই ধরনের মারগুলিকে লেআপ, অ্যাপ্রোচ (লম্বা থেকে মাঝারি দূরত্ব), পিচ বা চিপ বলে। বল সবুজ অঞ্চলে পৌঁছাবার পরের মারকে বলে পাট। গলফারের মূল লক্ষ্য থাকে যাবতীয় বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে যথাসম্ভব কমবার মেরে বল গর্তে ফেলা।

গলফ দণ্ড
গলফ বল মারার জন্য গলফ দণ্ড  লাগে। এই লাঠিটাকে গলফ স্টিক বা ক্লাব বলা হয়। এদের আবার ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে। যেমন ড্রাইভার দণ্ডটি সবচেয়ে বড়। টি-ক্ষেত্র থেকে লম্বা দূরত্বে ব্যবহার করা হয়। এর থেকে একটু ছোট হল উড। ফেয়ারওয়েতে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এর থেকেও ছোট মাপের দণ্ডকে বলে আয়রন। সবুজ অঞ্চলে বল মেরে গর্তে ফেলার জন্য পাটার নামে দণ্ড ব্যবহৃত হয়। আয়রন আর উডসের মিশ্রণে ‘হাইব্রিড’ নামের কিছু ক্লাব আছে। একজন খেলোয়াড় একটি খেলায় অনধিক ১৪টি দণ্ড ব্যবহার করতে পারে। দণ্ডের পছন্দ খেলোয়াড়ের হলেও সেগুলি নিয়মানুসারে নির্মিত হতে হয়। নচেৎ খেলা থেকে বহিষ্কারের সম্ভাবনা থাকে।

স্কোরিং
পারের উপর নির্ভর করে স্কোরিং ও গর্তের শ্রেণীবিভাজন। পার মানে কতবার মেরে একজন দক্ষ গলফার টি থেকে গর্তে বল ফেলতে পারে তার হিসাব। বিভিন্ন গর্তে বল ফেলার জন্য বিভিন্ন পারের সংখ্যা রয়েছে। আসলে টি থেকে গর্তের দূরত্বই পার এর সংখ্যা ঠিক করে।
সাধারণত পার-তিনের (তিন শটে বল গর্তে ফেলা) ক্ষেত্রে এই দূরত্ব ২৫০গজ, পার-চারের ক্ষেত্রে ২৫১ থেকে ৪৭৫গজ, আবার পার-পাঁচের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব ৪৭৫ গজের বেশি। সচরাচর যদিও পার-ছয় ও সাত দেখা যায় না; তবে দৈর্ঘ্য ৬৫০ গজেরও বেশি হয়। গলফ মাঠের ঢালের উপরেও পার সংখ্যা নির্ভর করে। ১৮ গর্তের গলফ মাঠে চারটি পারের তিনটি, দশটি পারের চারটি ও চারটি পারের পাঁচটি গর্ত থাকতে পারে। তবে এই বিভাজন অন্য রকমও হতে পারে। সবমিলিয়ে সাধারণত ৭০, ৭১ বা ৭২ পারের খেলা হয়।
গলফ খেলার মূল লক্ষ্য হলো যথাসম্ভব কমবার বল মারা। স্কোরিংটা হয় ৭১ শটের চেয়ে কম খেললেন, নাকি বেশি খেলে ফেললেন। যারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে, তারা অবশ্যই পারের চেয়ে কম শট খেলে। দিন শেষে যখন বলা হয় অমুক টু-আন্ডার পার স্কোর করেছে, তার মানে সে দুটো শট কম, অর্থাৎ ৬৯ শটে রাউন্ড শেষ করেছে।
স্কোরকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। এসব নাম শুধু প্রতি হোলের স্কোরের জন্য। যেমন চার পারের খেলায় এক শটেই বল গর্তে ফেলে দেয় তাহলে স্কোরটাকে বলে অস্ট্রিস। আবার এক শট কম খেলে গর্তে বল ফেললে বলা হয় ব্রিডল। এভাবে ২, ৩, ৪ শট কম খেলে গর্তে বল ফেললে বলা হবে যথাক্রমে ইগল, অ্যালব্যাট্রস ও কনডর। উল্টোটাও আছে। পারের চেয়ে এক শট বেশি খেললে সেটাকে বলা হয় বোগি, দুই শট বেশি খেললে সেটা ডাবল বোগি।
দুজন খেলোয়াড় বা দলের স্কোর সমান হলে হেলভড (টাই) হয় ম্যাচ। সে ক্ষেত্রে বেশি হোল জেতা খেলোয়াড় বা দলই জয়ী হবে। হোল ইন ওয়ান বা এস হলো যখন একজন গলফার টি থেকে বল মেরে সরাসরি একবারে গর্তে ফেলে দেয়।

পেনাল্টি
গলফ খেলায় পেনাল্টি মানে একজন খেলোয়াড়ের বল মারার সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া। বল হারিয়ে ফেললে বা মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিলে, খেলোয়াড়ের সরঞ্জাম বা আলগা ঘাস সরাতে গিয়ে যদি বল সরে যায় অথবা ভুল বল মারা, অন্য গলফারের বল মারা হয় তাহলে বিভিন্ন রকমের পেনাল্টি হয়। এছাড়া অসৎপন্থার জন্য খেলা থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশে গলফ
বাংলাদেশে গলফ খেলার শুরু পঞ্চাশের দশকে। ১৯৫০ সালে দেশে প্রথম গলফ কোর্স করা হয় রমনা পার্কে। এ দশকেই রমনা পার্কের গলফ কোর্স চলে যায় বিমানবন্দর এলাকায়। ১৯৬০ সালে গলফ কোর্সটি নিয়ে আসা হয় ঢাকা সেনানিবাসে। এভাবেই কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের শুরু।
তবে ১৯৭১ সালের পর গলফে আরেকটু মনোযোগী হয় বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশের অধিকাংশ গলফ কোর্স গড়ে ওঠে আশির দশকে। এখন দেশে ১৫টি গলফ কোর্স রয়েছে। সেনানিবাসগুলোতে ১২টি, বাকি তিনটি সেনানিবাসের বাইরে। প্রাইভেট পাকশি, ছাতক ও চট্টগ্রাম কোরিয়ান ইপিজেডে।
টুর্নামেন্ট হলেও খেলা শেখানোর জন্য বাংলাদেশে স্থায়ী কোনো বিদেশি প্রশিক্ষক নেই। তবে মাঝেমধ্যে বিদেশি প্রশিক্ষক আনা হয়।
ভাটিয়ারি, সাভার ও কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব বাংলাদেশে ভালোমানের গলফ ক্লাব। কুর্মিটোলা ক্লাবে সদস্য হতে হলে ফি লাগবে আট লাখ টাকা। তবে সরকারি কর্মকতাদের ক্ষেত্রে লাগবে এক লাখ টাকা। কোনো বাহিনীর সদস্য হলে ফি ৩০ হাজার টাকা।
বিভিন্ন ধরনের সদস্যপদ রয়েছে যেমন স্থায়ী, অস্থায়ী, কর্পোরেট, সার্ভিস সদস্য ইত্যাদি। এছাড়াও অনারারি সদস্য পদ রয়েছে। প্রত্যেক ধরনের সদস্যের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা আছে। ভাটিয়ারি গলফ অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাবে আজীবন, কর্পোরেট, স্থায়ী ও সার্ভিস সদস্যপদ রয়েছে। আজীবন ও কর্পোরেট সদস্য হতে হলে ৬ লাখ টাকা। আর স্থায়ী সদস্যদের জন্য ফি ধার্য রয়েছে ৩ লাখ টাকা। সার্ভিস সদস্যদের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিল রয়েছে। তবে প্রত্যেক সদস্যকে মাসে ২ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। প্রতিবছর প্রায় ৩০টি টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়।
কুর্মিটোলা ক্লাবে ননমেম্বার ও গেস্ট মেম্বারদের জন্য প্রতি সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত ১৮ হোলের জন্য ১৩২০ টাকা ও ৯ হোলের জন্য ৭৪০ টাকা দিয়ে খেলা  যাবে।  বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার গলফ খেলার জন্য যথাক্রমে ১৮ ও ৯ হোলের জন্য ২৬২০ ও ১৬৮০ টাকা পরিশোধ করতে হবে ।
দেশে  গলফের উপর ডিগ্রি নেয়ার কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকলেও বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ও গলফ অ্যাসোসিয়েশন থেকে ৩/৪ বছরের প্রফেশনাল গলফ ম্যানেজমেন্ট নামে ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ আছে। যেমন- মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি, ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি, পিজিএ গলফ ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি।

গলফে ক্যারিয়ার
গলফ খেলার সাথে জড়িত বিভিন্ন পেশায় ক্যারিয়ার গড়া যেতে পারে। যেমন বলবয়, ক্যাডি, গ্রিনকিপার, ক্লাব সেক্রেটারি, কোর্স ডিজাইনার, হেলথ অ্যান্ড ফিটনেস ট্রেইনার, ফিজিওলোজিস্ট, টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর, কোচ  আর খেলোয়ার বা  গলফার হিসেবে। বলবয় হলো যিনি মাঠে বল কুড়িয়ে দেন। ক্যাডি হলো খেলোয়ারের ব্যাগবহনকারী। বাংলাদেশে এক দিনে বলবয় ও ক্যাডিকে ১২০ টাকা ১৮০ টাকা দেওয়া হয়।
খেলোয়ার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে আপনাকে প্রথমে যেকোনো গলফক্লাবের সদস্য হতে হবে। অবশ্যই আপনাকে গলফ কোর্সে যেতে হবে। সেখানে সামান্য কিছু ফি’র মাধ্যমে বল নিতে হবে। শুরু করতে হবে প্র্যাকটিস। প্র্যাকটিসে যদি ভালো করতে পারেন, তবে গলফ ক্লাবে সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। প্রথম দিকে জুনিয়ার গলফার তারপর জাতীয় দলে খেলা। তারপর প্রথম দিকে বিদেশী অপেশাদার তারপর পেশাদার টুর্নামেন্ট খেলতে হবে। আরো জানতে ভিজিট করুন-
কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব : www.kgc-bd.com
ভাটিয়ারি গলফ ক্লাব : www.bhatiarygolfclub.com

 

লেখক :
তালহা বিন জসিম
একটি জাতীয় দৈনিকের সহ-সম্পাদক

Career Intelligence on Youtube